রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো জাদুর মঞ্চ নয়, যেখানে একজন নতুন শাসক এসে রাতারাতি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সংকটাপন্ন জ্বালানি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতাকে মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক করে তুলবেন। রাষ্ট্র পরিচালনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; আর রাষ্ট্রের ক্ষত যত গভীর, সুস্থ হতে সময়ও তত বেশি লাগে।
আজ যখন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিদ্যুৎ, গ্যাস, দ্রব্যমূল্যসহ নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রশ্ন উঠছে—সমাধান কোথায়? এই প্রশ্ন অমূলক নয়। কারণ জনগণ সরকারের কাছে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও আমাদের নিজেকে করতে হবে—ক্ষমতা হস্তান্তরের পর একটি সরকারকে আমরা কতটুকু সময় দিয়েছি?
একটি সরকারকে মূল্যায়নের জন্য তার হাতে থাকা সময়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পরিস্থিতি এবং বাস্তব সীমাবদ্ধতা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। দীর্ঘ শাসনপর্বে অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে এবং দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচারের যে অভিযোগ এতদিন আলোচনায় ছিল, তার প্রভাব একদিনে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করতে গেলে প্রথম কাজ হয় ভিত্তি শক্ত করা। সেই কাজটি বাইরে থেকে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও ভবিষ্যৎ স্থাপনার জন্য সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা দ্রব্যমূল্যের চাপ—এই বাস্তবতাগুলোকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করার আগে আমাদের জানতে হবে, সমস্যাগুলোর শিকড় কতটা গভীরে। কোনো দায়িত্বশীল সরকারই চায় না দেশের মানুষ ভোগান্তিতে থাকুক। বরং এসব সংকটের সমাধান করাই সরকারের রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান শর্ত।
একটি দেশের অর্থনীতি যদি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে নির্দিষ্ট সময় লাগে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য যেমন সরকারের জবাবদিহিতা, তেমনি সরকারকে তার দায়িত্ব বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়াও এর অংশ। অন্ধ সমর্থন বা অন্ধ বিরোধিতা না করে আমাদের প্রয়োজন গঠনমূলক সমালোচনা। সময় দিতে হবে জবাবদিহির সঙ্গে, আর সুযোগ দিতে হবে ফলাফলের প্রত্যাশা রেখে।
(লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল)