চারিদিকে যখন পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ, নতুন পোশাকের সুবাস আর কোরবানির পশু কেনার ব্যস্ততা, ঠিক তখনই এক বুক কষ্ট ও অনিশ্চয়তা নিয়ে জীবনের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বৃদ্ধা আমেনা বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, হাতে একটি বাঁশের কঞ্চি আর চোখে শূন্যতা—উৎসবের এই আবহে ঈদ তাঁর কাছে কোনো আনন্দের বার্তা নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আরেকটি কঠিন দিনের নাম।
আজ বুধবার (২৭ মে) বিকেলে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা সড়কে দেখা যায় হৃদয়স্পর্শী এই দৃশ্য। কাদা মাখা খালি পায়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন সত্তোরোর্ধ্ব আমেনা বেগম। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে কখনো রাস্তার পাশে বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার পথচারীদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছেন—শুধু যদি কেউ একটি শাড়ি বা নতুন কাপড় কিনে দেয়, সেই আশায়।
এক যুগ আগে হারিয়েছেন স্বামীকে, নেই কোনো ঠিকানা:
কথা বলার সময় নিজের নাম আমেনা বেগম জানালেও প্রথমে স্বামীর নাম বলতে অনীহা প্রকাশ করেন এই বৃদ্ধা। পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, তাঁর স্বামীর নাম ছিল লাল মামুদ, যিনি মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং প্রায় এক যুগ আগে মারা গেছেন।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের রুপিয়ারচর গ্রামেই আমেনা বেগমের বসবাস ছিল। তবে এখন নিজের বলতে কোনো ভিটেমাটি বা মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তাঁর। কখনো এ বাড়ি, কখনো ও বাড়িতে আশ্রয় নিয়েই রাত কাটে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও একটি স্থায়ী ঠিকানার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে তাঁর।
জামাইও ভিক্ষুক, মেয়ের সংসারেও চরম অভাব:
আমেনা বেগমের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মেয়ের সংসারের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। আমেনা বেগম জানান, তাঁর জামাইও একজন ভিক্ষুক। ফলে নুন আনতে পান্তা ফুরানো মেয়ের সংসার থেকে কোনো প্রকার আর্থিক বা সামাজিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই তাঁর।
ঈদ উপলক্ষে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাত্র ৫ কেজি (পাঁচ সের) চাল পেয়েছেন। কারও দেওয়া একটি স্লিপ বা কাগজ নিয়ে পরিষদে গিয়ে সেই চাল সংগ্রহ করেন তিনি। তবে ঈদের নতুন কাপড় কিংবা বিশেষ কোনো খাবারের ব্যবস্থা জোটেনি তাঁর কপালে।
মাংসের স্বাদ কেমন, মনে নেই আমেনার:
ঈদ নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এক বুক হাহাকার নিয়ে আমেনা বেগম আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, “ঈদ আইলে আমার কী? আমার তো বেকবেলায় হমান (সব দিনই সমান)। মানুষ তো আগের মতো গোস্ত দেয় না। এর লাইগ্যা যাইও না। কপালে থাকলে খাইয়ামনে।”
সর্বশেষ কবে মাংস দিয়ে তৃপ্তি করে ভাত খেয়েছিলেন—এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ পাথরের মতো নীরব থাকেন এই বৃদ্ধা। তারপর ধীর ও ভাঙা কণ্ঠে বলেন, “কিবায় কইয়াম… এইডা তো মনে নাই।”
কথাগুলো বলেই আবার কাঁপা কাঁপা হাতে বাঁশের কঞ্চি ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান আমেনা বেগম। ক্লান্ত শরীর আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ধীরপায়ে হাঁটতে থাকেন সামনের চেনা-অচেনা পথে। আর তাঁর এই নীরব প্রস্থান যেন সমাজের এক নির্মম বাস্তবতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সব মানুষের জীবনে ঈদ সমপরিমাণ আনন্দ নিয়ে আসে না।