কোরবানির ঈদের তীব্র ব্যস্ততার মাঝে মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের একটি ভবনের সামনে তখনো চলছে মাংস কাটার তোড়জোড়। মাঝারি আকারের একটি গরুর মাংস কাটায় ব্যস্ত তিনজনের একটি দল, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ২৩ বছর বয়সী তরুণ শামীম মিয়া। মুখে চরম ক্লান্তির ছাপ থাকলেও হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। কারণ, এটি ছিল তাঁর ঈদের দিনের পঞ্চম গরু কাটার কাজ। আজ কসাই হিসেবে শামীমের যে পেশাদারিত্ব, তার পেছনে লুকিয়ে আছে করোনা মহামারিতে এক স্কুলছাত্রের স্বপ্নভঙ্গের করুণ এক ইতিহাস।
করোনায় থমকে যাওয়া জীবন ও নতুন পথচলা:
করোনা মহামারির আগে শামীম ছিলেন আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই স্কুলের ছাত্র। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ শুরু হলে পুরো দেশে স্থবিরতা নেমে আসে এবং তাঁর পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। ফলস্বরূপ, দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থাতেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। পরবর্তীতে ‘অটো পাসের’ মাধ্যমে মাধ্যমিক (এসএসসি) পাসের সনদ পেলেও আর কোনোদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখা হয়নি তাঁর। তাই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলতে গিয়ে শামীম এখনো নিজেকে নবম শ্রেণি পাস হিসেবেই পরিচয় দেন।
বর্তমানে পরিবার নিয়ে ভাসানটেক বস্তিতে থাকেন শামীম। পড়াশোনা ছাড়ার পর জীবিকার তাগিদে ভাসানটেক বাজারের একটি গরুর মাংসের দোকানে সহকারীর কাজ শুরু করেন তিনি। ওই বাজারের ‘আল্লাহর দান গোশত বিতান’-এর প্রধান কসাই তাঁর আপন মামা আবদুল কুদ্দুস। মামার হাত ধরেই মূলত কসাইয়ের কাজের হাতেখড়ি শামীমের। কয়েক বছরের কঠোর পরিশ্রমে কাজ শিখে এখন নিজেই চুক্তি নিয়ে দক্ষতার সাথে গরু কাটার কাজ করেন এই তরুণ।
ঈদের দিনের ব্যস্ততা ও আয়ের হিসাব:
ঈদের দিন সকাল থেকেই দম ফেলার ফুসরত ছিল না শামীমের। মিরপুরে আসার আগে ঢাকা সেনানিবাস এলাকায় ইতিমধ্যেই চারটি গরু ও তিনটি খাসি কাটার কাজ শেষ করেছেন। এর মধ্যে দুটি গরুর কাজ করেছেন উস্তাদ তথা মামার সঙ্গে, আর বাকি দুটি নিজেই চুক্তি নিয়ে সম্পন্ন করেছেন।
কোরবানির ঈদে আয়ের রেট সম্পর্কে শামীম জানান, ঈদের দিন সকালে কাজের চাপ ও পারিশ্রমিক দুটোই বেশি থাকে। সকালে গরু কাটার জন্য পশুর মূল দামের ওপর প্রতি হাজারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ, এক লাখ টাকা দামের একটি গরু জবাই, চামড়া ছাড়ানো এবং সম্পূর্ণ মাংস কাটার পারিশ্রমিক আসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। তবে দুপুরের পর চাপ কমে যাওয়ায় রেটও কমে যায়; তখন প্রতি হাজারে ১০০ টাকা হিসাবে কাজ করতে হয়।
গতি ও সময়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, সকালে শরীরে শক্তি বেশি থাকায় এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই একটি গরুর কাজ শেষ করা যায়। তবে দুপুরের পর শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে একেকটি গরুর মাংস প্রস্তুত করতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টাও লেগে যায়। এছাড়া খাসির আকার অনুযায়ী প্রতিটি খাসি কাটার জন্য দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়।
নিজের চুক্তিতে করা দুটি গরুর কাজ থেকেই শামীমের প্রায় ১৯ হাজার টাকা পাওয়ার কথা, যা থেকে তাঁর দুই সহযোগীর পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে হবে। আর মামার সাথে করা কাজের পারিশ্রমিক মামাই নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।
বাড়তি আয়ের খোঁজে চালক ও দিনমজুর:
শামীমের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করা সোহাগ হোসেন পেশায় একজন পিকআপ ভ্যানের চালক। ঈদের দিন অতিরিক্ত আয়ের আশায় কসাইদের সাথে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দা সোহাগ বলেন, “একটি গরুর মাংস কাটার কাজ করে ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত মেলে। গত বছর ঈদের দিন সাতটি গরুর কাজ করে প্রায় ৬ হাজার টাকা আর সাথে কয়েক কেজি মাংস পেয়েছিলাম।”
আরেক সহযোগী আল-আমিনের মূল পেশা সদরঘাট এলাকায় লঞ্চ বা গাড়িতে মালামাল ওঠানো-নামানো করা। ঈদের ছুটিতে পরিবারের কাছে এসে বাড়তি কিছু উপার্জনের জন্য তিন বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। গত কোরবানি ঈদে তাঁর সাড়ে চার হাজার টাকা আয় হয়েছিল বলে জানান আল-আমিন।
মহামারির থাবায় পড়াশোনা হারিয়ে যাওয়া শামীম কিংবা উৎসবের দিনেও হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা সোহাগ-আল আমিনদের এই গল্প যেন মনে করিয়ে দেয়—জীবনের কঠিন বাস্তবতায় মানুষ কীভাবে শ্রম আর সততা দিয়ে বেঁচে থাকার নতুন পথ খুঁজে নেয়।