টাঙ্গাইলের খামারি ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হামিদা আক্তারের ১০ বছর ধরে পরম মমতায় লালন-পালন করা ৫৬ মণের সেই বিখ্যাত ষাঁড় ‘মানিক’ এখন কুষ্টিয়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা হামিদার অসহায়ত্ব ও ধারদেনার কথা জানতে পেরে গরুটি কিনে নিয়েছে ‘আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন’। আগামী পবিত্র ঈদুল আজহার তৃতীয় দিনে গরুটি কোরবানি দিয়ে এর মাংস বিতরণ করা হবে স্থানীয় এতিম ও অসহায় মানুষের মধ্যে।
আজ বুধবার (২৭ মে) কুষ্টিয়ায় ফাউন্ডেশনের খামারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনশেডের পাকা ঘরে যত্নে রাখা হয়েছে ‘মানিক’–কে। তার মাথার ওপর সার্বক্ষণিক ঘুরছে ফ্যান। খামারের কর্মচারী রেহেনা বেগম জানান, গত সোমবার টাঙ্গাইল থেকে গরুটি কুষ্টিয়ায় আনা হয়েছে এবং তাকে অত্যন্ত উন্নতমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাপারি বা কসাইয়ের কাছে বেচিনি, এতেই খুশি হামিদা:
মানিককে হারানোর কষ্ট থাকলেও ভালো ক্রেতা পাওয়ায় সন্তুষ্ট খামারি হামিদা আক্তার। মুঠোফোনে তিনি বলেন, “আমার এতটুকুই লাভ হয়েছে যে আমি কিছু ঋণ শোধ করতে পারছি। সব সময় ইচ্ছা ছিল ভালো একটা লোক পাইলে তার কাছে বিক্রি করব মানিকরে। তাতে লস-লাভ দুই টাকা কমবেশি হোক। তবু কোনো ব্যাপারি কিংবা কসাইয়ের কাছে মানিকরে বেচব না। ভালো লোকের কাছে বিক্রি করতে পেরে খুব খুশি।”
হামিদা জানান, গত বছর একজন ১৫ লাখ টাকা দাম বলেছিলেন। এবার একজন ১৮ লাখ টাকা হাঁকিয়ে আর ফিরে আসেননি। তাঁর ইচ্ছা ছিল ২০ লাখ টাকায় গরুটি বিক্রি করবেন। কিন্তু শেষ সময়ে বাজারে বড় গরুর ক্রেতা না পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দামের চেয়ে বেশ কম দামেই বিক্রি করতে হয়েছে।
খরচের অর্ধেক টাকাই ওঠেনি:
১০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা তুলে ধরে হামিদা আক্তার বলেন, “১০ বছর ধইরা পালন করতেছি। খরচের অর্ধেক টাকার চালান উঠে নাই। কষ্ট পরিশ্রম, রাতজাগা এগুলা তো সব বাদই। মানিক প্রতিদিন ১০ হালি করে বিচি কলা খায়, ৪ কেজি করে বুট খায়, ভুসি যতটুকু পারে। আর এক কেজি আতপ চালের ভাত খায়। অনেক টাকা ধারদেনা হয়ে গিয়েছিল। তাই কম দামে হলেও বিক্রি করে ঋণ শোধ দিছি। এখনো ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ আছে আমার।”
জীবনসংগ্রাম ও নারী উদ্যোক্তার স্বপ্ন
হামিদা আক্তারের জীবনগল্পটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। স্নাতকে পড়ার সময় তাঁর মা মারা যান। পরিবারে রয়েছে ছোট বোন আর বৃদ্ধ বাবা। এত প্রতিকূলতার মাঝেও বর্তমানে তিনি মাস্টার্সে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন এবং বাড়ির খামার দেখাশোনা করেন। লোকসান হলেও ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে একটি আদর্শ ডেইরি খামার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এই লড়াকু তরুণী।
ফাউন্ডেশনের মানবিক উদ্যোগ:
আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম জানান, অনলাইনে নারী উদ্যোক্তা হামিদার ঋণের বোঝা ও মানিকের ক্রেতা না পাওয়ার অসহায়ত্বের বিষয়টি তাদের নজরে আসে। এরপরই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে গরুটি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মানিকের মাংস দিয়ে ঈদের তৃতীয় দিনে শত শত অসহায় ও এতিম শিশুর মুখে হাসি ফোটানো হবে।