
রাজধানীর মিরপুরে একাকী ঘরে পড়ে থেকে উচ্চ প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের মা নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সমাজ ও পারিবারিক সম্পর্কের এই চরম অবক্ষয় নিয়ে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত আবেগঘন ও বিবেকঝাঁকুনি দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন দেশের জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।
নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জাগতিক সফলতার অন্ধ দৌড় এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবকে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন।
কথিত সফলতার স্বর্ণচূড়া ও এক করুণ বাস্তব:
শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর পোস্টের শুরুতে মিরপুরের ওই হৃদয়বিদারক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে লেখেন, “সাত-আটদিন আগে ময়লার ভাগাড়ের মতো এই ঘরে মরে পচে গেছেন এমন এক বৃদ্ধা, যার এক ছেলে বুয়েট-শিক্ষক, আরেক ছেলে যুগ্ম-সচিব, অন্য ছেলে কানাডা-প্রবাসী। এদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানকে কথিত সফলতার যে স্বপ্নচূড়ায় দেখতে চান, বৃদ্ধার তিন ছেলেই জাগতিক সাফল্যের সেই স্বর্ণচূড়া স্পর্শ করেছে।”
সন্তানদের এই বৈষয়িক অন্ধত্বের সমালোচনা করে তিনি লেখেন, “কিন্তু মাঝখানে একটা ঈদ গেল, মা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে থাকা সন্তানদের খোঁজ নেয়ার হয়তো সুযোগটুকুও ঘটেনি। একাকী ঘরের মধ্যে মরে শরীরের মাংস খসে খসে পড়েছে বৃদ্ধার।”
প্রয়োজন নেই এমন সফলতার:
জাগতিক মোহে অন্ধ হয়ে মা-বাবাকে ভুলে যাওয়ার এই প্রবণতাকে ধিক্কার জানিয়ে এই জনপ্রিয় আলেম বলেন, “যে সফলতা বাবা-মার ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়, যে সফলতা মৃত্যুর সময়ও এক আঁজলা পানি নিয়ে মায়ের মাথার কাছে বসার ফুরসত দেয় না, আমাদের প্রয়োজন নেই এমন সফলতার। দীন, মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানুষ হওয়ার শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যতদিন আমরা শুধু বস্তুবাদ ও বৈষয়িক সফলতার পেছনে ছুটব, ততদিন এই ধরনের অনাকঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের দেখে যেতে হবে। আসুন, শিক্ষিত হওয়ার আগে মানুষ হই। সন্তানকে শিক্ষিত বানানোর আগে মানুষ বানাই।”
বিদেশে পাঠানো এখন সামাজিক মর্যাদা ও গল্পের কন্টেন্ট:
বর্তমান সমাজের অন্ধ প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, “সন্তানকে বিদেশে পাঠানো এখন সামাজিক মর্যাদা এবং অন্যের কাছে গল্প করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ সন্তান দূরে থাকা প্রত্যেক বাবা-মার জন্যই সীমাহীন কষ্টের বিষয়। তারপরও বস্তুবাদ ও বৈষয়িক মর্যাদার হাতছানিতে অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানকে বিদেশে পাঠাতে মরিয়া। যার ফলাফল, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন।”
বার্ধক্যকে পরিবারবেষ্টিত ও আনন্দময় করার উপায় বাতলে দিয়ে তিনি তাঁর পোস্টের শেষে লেখেন, “অথচ আমরা যদি অল্পে তুষ্ট থাকি, সন্তানকে গর্ব ও মর্যাদার কন্টেন্ট না বানিয়ে নিজের কাছে আগলে রাখি, তবে পরিবারবেষ্টিত আমাদের বার্ধক্যও হবে আনন্দময়।”
শায়খ আহমাদুল্লাহর এই পোস্টটি ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং হাজার হাজার নেটিজেন তাঁর এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে সমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় রোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।