সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নে কপোতাক্ষ নদের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ‘গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ এখন যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুফাঁদ। গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ভবনের ছাদের একটি বড় অংশ ধসে পড়েছে। যদিও ছুটির দিন হওয়ায় কোনো শিক্ষার্থী হতাহত হয়নি, কিন্তু ভবনটির বর্তমান যে নাজুক অবস্থা, তাতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত উপকূলের এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটির ভবন ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ ১৯৯৫ ও ২০০১ সালে নির্মাণ করেছিল। কিন্তু আইলা, ইয়াস ও রিমালের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণ পানি ঢুকে ভবনটিকে ধ্বংসস্তূপের পরিণত করেছে। বর্তমানে দেয়াল খসে পড়া, জানালাহীন কক্ষ এবং পিলারের লোহা বেরিয়ে আসা ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী। বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা একটি ছোট টিনের ঘরে ঠাসাঠাসি করে নবম, দশম ও একাদশ শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র শিক্ষক বলেন, “আমরা ক্লাস নিতে আসি না, মৃত্যুর মুখে আসি। টিনশেডে ৫০ জনের জায়গায় ১৫০ জনকে বসাতে হচ্ছে, গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। একে কি শিক্ষা বলে?” অভিভাবক রাবেয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে বুক কাঁপে। সরকার কি আমাদের গরিব বলে মানুষ মনে করে না?”
প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাইফুল হায়দার বলেন, “আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দোয়া করি আজ যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত, মৌখিক এবং ইমেইল—সব উপায়ে জানিয়েছি। এখন যদি ২৫০ শিক্ষার্থীর কিছু হয়, এর দায় কে নেবে?”
কয়রা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি নিজে ভবনটি পরিদর্শন করেছেন এবং এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে এবং নতুন ভবন বরাদ্দের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ উপকূলের ঐতিহ্য। এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ নতুন একাডেমিক ভবন ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। আমি শিক্ষা ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছি, খুব শিগগিরই সুখবর আসবে।”
ছাদ ধসের ঘটনার পর এলাকাবাসী, শিক্ষক সমাজ ও সুশীল নাগরিকরা একত্রিত হয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়; ২৫০ শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচাতে অবিলম্বে নতুন বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় তারা রাজপথে কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।