শিকদারের ভয়াল দিনের পুনরাবৃত্তি খুলনায়, ফের ব্যবসা গুটিয়ে নওয়াপাড়ামুখী হওয়ার শঙ্কা
কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের সময়ে খুলনার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, মিল-কারখানার মালিকরা ব্যবসা গুটিয়ে নওয়াপাড়া বা অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন – এই পর্যবেক্ষণটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। বর্তমান খুলনাও সেই একই পথে হাঁটছে।
১. এরশাদ শিকদার আমলে কী হয়েছিল? তথ্য যাচাই:
তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠির দরিদ্র পরিবার থেকে আসা এরশাদ শিকদার খুলনার ঘাটে কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ছোটখাটো চুরি থেকে জেল গ্রুপ গঠন করে রেললাইন চুরি করে মাত্র দুই বছরে ২ কোটির বেশি টাকা কামান।
খুলনা জেটি দখলের জন্য তিনি হত্যা, অপহরণসহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। ২০ বছরে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার মালিক হন, সোনাডাঙ্গায় ‘স্বর্ণকমল’ নামে প্রাসাদ, বরফকল, ময়দা মিল, চিংড়ি ঘের ও শপিং সেন্টারের মালিক হন।
১৯৯১ সালে ৪ নম্বর ঘাটের রফিক নামে এক বরফকল মালিককে ভয় দেখিয়ে তার বরফকল দখল করেন এবং ওই বরফকলটিই পরে তার নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তার এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণেই ৮০-৯০ এর দশকে খুলনা নদী বন্দর অচল হয়ে পড়ে এবং ব্যবসায়ীরা নিরাপদ স্থান হিসেবে নওয়াপাড়াকে বেছে নেন।
নওয়াপাড়া বন্দর কিভাবে হলো?
ইতিহাস বলছে, নওয়াপাড়া বন্দরের উৎপত্তি ১৯ শতকে হলেও ২০০৪ সালের এপ্রিলে এটি পূর্ণাঙ্গ নদী বন্দর হিসেবে ঘোষণা পায় এবং ২০০৭ সালের মে মাসে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল খুলনা বন্দরের ওপর চাপ কমানো এবং মোংলা থেকে আসা পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া। ভৈরব নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি এখন ৫১.৫৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
২. বর্তমান পরিস্থিতি – ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি:
– “রেস্টুরেন্ট-হাসপাতাল সহ বিভিন্ন জায়গাতে চাঁদার জন্য হামলা” – এটি গত এক সপ্তাহের ঘটনা।
– চাইনিজ প্যালেসে হামলা:
গত ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৩টায় খুলনার ব্যস্ততম আহসান আহমেদ রোডের চাইনিজ প্যালেস।রেস্টুরেন্টে ২০-২২ বছর বয়সী ৪ জন যুবক ঢুকে চেয়ার দিয়ে কাচ ভাঙচুর করে।কারণ, “ভাইয়ের ফোন ধরিস না কেন”। পুলিশ বলছে, কারাগার থেকে মুক্তিপাওয়া এক সন্ত্রাসীর সহযোগীর ফোন না ধরায় এই হামলা।
– ক্ক হামলা ওএর ঠিক আগে ২৪ অক্টোবর রাতে সন্ধানী ক্লিনিকের সামনে ফাঁকা গুলি ও ভাঙচুর কুইন্স হাসপাতাল, প্রিন্স হাসপাতাল, সুরক্ষা ক্লিনিক ও সন্ধানী ক্লিনিকের আরেক শাখায় অস্ত্রধারীদের মহড়া ও চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটেছে।
– ফার্মেসি বন্ধ:
চয়নিকা ফার্মেসির কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করায় নিরাপত্তাহীনতায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে। মালিক বাসা ছেড়ে পালিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
৩. পুলিশ কী বলছে?
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার রেজাউর রহমান জানিয়েছেন, গত ১০ মাসে ৬০ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা অনেকেই ভয়ে মামলা করতে চান না।
এরশাদ শিকদারের সময়ে যেমন চাঁদাবাজি ও হত্যার কারণে খুলনার শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে নওয়াপাড়ায় স্থানান্তরিত হয়েছিল, বর্তমানেও একই ধারায় কিশোর গ্যাং ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে খুলনা ফের পঙ্গু হওয়ার পথে।
যদি এখনই এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ না হয়, তবে ব্যবসায়ীরা আবারও খুলনা ছেড়ে নওয়াপাড়া বা অন্য নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হবেন – এটাই ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা।
বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্ট
রবি মল্লিক, কালান্তর নিউজ