কুয়াকাটায় সূর্যাস্ত দেখতে গিয়ে পর্যটকদের পকেটে যেন সূর্যগ্রহণ! সম্প্রতি ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬’ ঘিরে পর্যটকদের জন্য হোটেল ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে এর উল্টো চিত্রের অভিযোগ উঠেছে। পর্যটকদের অভিযোগ, ছাড়ের পরিবর্তে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দাবি করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তাঁরা।
কালান্তর নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কার্নিভালের আগে কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন একটি জরুরি নোটিশ জারি করে। সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদ হাসান স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়।
১. ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সব হোটেলে বাধ্যতামূলক ৫০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে।
২. রিসেপশনে ছাড়কৃত ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে রাখতে হবে।
৩. নির্ধারিত তালিকার বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যাবে না।
৪. হোটেলগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আলোকসজ্জা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, কার্নিভালকে ঘিরে ৩ থেকে ৪ লাখ পর্যটকের আগমনের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। এ জন্য ৩০০টিরও বেশি হোটেল-মোটেল প্রস্তুত রাখার কথাও জানানো হয়।
পর্যটকদের অভিযোগ, ঘোষিত ছাড়ের সঙ্গে বাস্তব ভাড়ার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, সাধারণ সময়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় পাওয়া যায় এমন নন-এসি ডাবল রুমের ভাড়া কার্নিভালের সময় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে হোটেল গোল্ডেন ইন-এর নামও উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
একইভাবে, সাধারণ মানের যেসব রুমের নিয়মিত ভাড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, সেগুলোর জন্য ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাজেট নিয়ে কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা রুম না পেয়ে সৈকতের বেঞ্চ, বাস কাউন্টার কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কার্নিভালের আনন্দ নিতে এসে পকেট ফাঁকা হবে জানলে ঘরে বসেই ইউটিউবে সৈকত দেখতাম!”
১. ৫০ শতাংশ ছাড়ের নোটিশ কি শুধু লোক দেখানো?
ছাড়ের ঘোষণা বাধ্যতামূলক হয়ে থাকলে তা বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারি কোথায়? হোটেলগুলোতে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানো হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২. অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ন্ত্রণ করবে কে?
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন আয়োজক হিসেবে থাকলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে ভুক্তভোগী পর্যটকেরা কোথায় অভিযোগ করবেন? তাঁদের জন্য কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা ও হটলাইনের তথ্য কতটা প্রচার করা হয়েছে?
৩. কুয়াকাটার সুনাম ক্ষুণ্ন হলে দায় নেবে কে?
পর্যটকদের সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ অব্যাহত থাকলে কুয়াকাটার পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কয়েক লাখ পর্যটক আকর্ষণের প্রত্যাশা থাকলেও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে ভ্রমণকারীরা অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলে দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
কুয়াকাটায় পর্যটকদের ভোগান্তি কমাতে শুধু আলোঝলমলে মঞ্চ ও উৎসবের আয়োজন করলেই হবে না, হোটেল-মোটেলের ভাড়ার তালিকা যাচাই করে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ৫০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা অমান্য করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পর্যটন উৎসবের মূল উদ্দেশ্য পর্যটকদের স্বাগত জানানো, তাঁদের পকেটে চাপ সৃষ্টি করা নয়। কুয়াকাটার সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে যেন কাউকে ভোগান্তি নিয়ে ফিরতে না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার।
রবিউল ইসলাম রবি মল্লিক
খুলনা প্রতিনিধি, কালান্তর নিউজ