ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল
জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির যোদ্ধা, গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম (৩২) কে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের এমপির ছেলের বিরুদ্ধে।
আর সেই ছেলের বাবা, নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের বিএনপি দলীয় এমপি মো. আব্দুল আজিজ নিহতের জানাজায় দাঁড়িয়ে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা দিয়েছেন। তখনই জানাজার মাঠ থেকে উঠেছে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান। প্রশ্ন উঠেছে — একজন জুলাই যোদ্ধার জীবনের মূল্য কি ২০ লাখ টাকা?
আপনি যে ছবিটি দিয়েছেন, সেটি জুলাই আন্দোলনের সময়কার শাকিলের প্রতিবাদী অবস্থানের ছবি — হাতে লাঠি, পেছনে আগুন, সামনে বুক পেতে দাঁড়ানো। সেই ছেলেটিই আজ লাশ।
ঘটনার বিস্তারিত টাইমলাইন:
১৪ অক্টোবর, রাত সাড়ে ১০টা: চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন শাকিল। পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা তাকে ধাওয়া করে চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায় এবং গুলি করে পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ।
১৯ অক্টোবর: শাকিলের বাবা রবিউল করিম বাদী হয়ে গুরুদাসপুর থানায় ৮-১০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। তার অভিযোগ, তিনি এজাহারে নাম দিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ অজ্ঞাত হিসেবে রেকর্ড করে। এর আগেও শাকিল জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছিল, ফেসবুকে লিখেছিল — পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি।
২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টা: ১২ দিন রাজশাহী মেডিকেল ও পরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে শাকিল মারা যান।
২৬-২৭ অক্টোবর রাত: মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সভাপতির নেতৃত্বে এমপি আব্দুল আজিজকে অবরুদ্ধ করেন নেতাকর্মীরা। সেখানেই তার বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু (গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক) কে গ্রেপ্তার ও ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি ওঠে। রাত ১টায় ধারাবারিষা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।
২৭ অক্টোবর বিকাল: নাটোরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মাহমুদুল হাসান ১০ দিনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতে মিন্টুর পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। মিন্টু দাবি করেন, “আমি কিছুই জানি না, ফেসবুকের প্রচারণায় আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।”
২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টা, জানাজা: বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজা। এমপি আব্দুল আজিজ মাইকে বলেন, “প্রিয় ভাইয়েরা আমার, আমার একটা কথা শুনতে হবে দাদারা।”সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লিরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন। পরে হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এরপর এমপি ২০ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিতেই আবার উত্তেজনা ছড়ায়। জানাজা শেষে চাঁচকৈড় বাজারে আমেরিকা প্রবাসী রাসেলের রাশ আরবানী শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
এমপি আব্দুল আজিজ নিজেই বলেছেন, “অপরাধী আমার সন্তান হলেও তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।” তাকে ইতিমধ্যে যুবদল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়:
১. অজ্ঞাত মামলা কেন? বাবা নাম দিলেও পুলিশ কেন অজ্ঞাত লিখল?
২. ১২ দিন শাকিল জীবিত ছিল, পুলিশ কেন তার জবানবন্দি নেয়নি?
৩. জানাজায় টাকার ঘোষণা — এটা কি বিচার নাকি বিচারকে কেনার চেষ্টা?
একজন জুলাই যোদ্ধা, যিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় আগুনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তার জীবনের দাম ২০ লাখ হতে পারে না। তার পরিবার টাকা চায় না, বিচার চায়।
#বিচার_চাই #নাটোরের গুরুদাসপুরের ঘটনা #আমজনতা