নদীর পাড়ে সারি সারি জেলে নৌকা নোঙর করা। নৌকা ভর্তি বাঁশ, জাল, হাঁড়ি-পাতিল, চালের বস্তা ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এটি সুন্দরবন উপকূলের চিরচেনা দৃশ্য। ভাটার সময় নৌকা মেরামত ও শেষ প্রস্তুতি। ছোট ডিঙি নৌকায় করে মালামাল ওঠানো। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ যাত্রার ঠিক আগ মুহূর্ত।
এরা কারা, কোথায় যাচ্ছে?
এটি সুন্দরবনের বার্ষিক শুঁটকি মৌসুমের জেলেবহর। প্রতি বছর শীতের শুরুতে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার থেকে হাজারো জেলে দুবলার চরের চারটি শুঁটকি পল্লী – মাঝেরকিল্লা, আলোরকোল, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালা চরে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন।বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবর থেকে ঘর নির্মাণ শুরু হয় এবং কার্যক্রম চলে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ৫ মাস।
জেলেরা যাতায়াতসহ প্রায় ৬ মাস পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাই আপনাদের স্থানীয় ভাষায় ৬ মাস বলা হয়। এই সময়ে সুন্দরবনের কোনো গাছ বা সম্পদ ব্যবহার করে ঘর বানানো নিষিদ্ধ, সবকিছু বাইরে থেকে আনতে হয়।
সুন্দরবন কি আসলেই দস্যুমুক্ত?
সরকার ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করলেও, বাস্তবতা হলো দস্যুতা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।
– টোকেন বাণিজ্য এখনো আছে:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৫ দিনের জন্য বনে যেতে নৌকা প্রতি ৫০০০ টাকা আগাম চাঁদা দিয়ে দস্যুদের কাছ থেকে স্লিপ বা টোকেন নিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
– সর্বশেষ অপহরণ:
মাত্র ২ দিন আগে, ২৭ অক্টোবর শ্যামনগরের কাছে সুন্দরবনের ভেতরে ‘দাদা ভাই বাহিনী’ ৫ জন জেলেকে অপহরণ করে পরিবার প্রতি ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
সরকার কী করছে?
– বর্তমানে সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে দুটি বিশেষ অভিযান চলছে – অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” ও “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড”।
– কোস্ট গার্ড ২৪ ঘণ্টা টহলের জন্য সশস্ত্র জাহাজ ও হাই-স্পিড বোট মোতায়েন করেছে এবং জরুরি হেল্পলাইন ১৬১১১ চালু রেখেছে।
– গত মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়া ও দস্যুদের কারণে ৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৫৪৩১.৭ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন ও ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। এবারও রাজস্ব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
নতুন উদ্যোগ:
এবারই প্রথম দুবলার চরে ৫ মাসের জন্য ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতাল ও স্পিডবোট সেবা চালু হচ্ছে, যাতে অসুস্থ জেলেরা দ্রুত চিকিৎসা পান।জীবিকার তাগিদে পরিবার ছেড়ে যাওয়া এই মানুষগুলো দেশের অর্থনীতিতে কোটি টাকা যোগ করছে।
তাই শুধু স্লোগান নয় – সুন্দরবনকে সত্যিকার অর্থে দস্যুতা মুক্ত করা, টোকেন বাণিজ্য বন্ধ করা এবং জেলে পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কালান্তর নিউজ | অনুসন্ধানী ডেস্ক, খুলনা