অবশেষে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার (ই-রিকশা) বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর বিধিমালা জারি করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে অতিরিক্ত সংখ্যায় “সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬” প্রকাশ করেছে।
এস.আর.ও. নং ৩৮২-আইন/২০২৬ মূলে এই বিধিমালা জারি করা হয়। এর ফলে ২০১৫ সালের পুরাতন বিধিমালা বাতিল হয়ে গেছে। এখন থেকে খুলনা সিটি কর্পোরেশনসহ (কেসিসি) দেশের সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এই নতুন আইন কার্যকর হবে।
গেজেটের প্রতিটি পৃষ্ঠা, প্রতিটি লাইন বিশ্লেষণ করে কালান্তর নিউজের পাঠকদের জন্য সারমর্ম তুলে ধরা হলো:
১. নিবন্ধন ছাড়া কোনো ই-রিকশা চলবে না
গেজেটে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ বা সরকার অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ছাড়া কোনো ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে না। তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা বলতে বোঝানো হয়েছে তিন চাকার স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারিচালিত রিকশা যার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার।
২. কারা আবেদন করতে পারবেন?
ই-রিকশার নিবন্ধন পেতে হলে-
(ক) বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে
(খ) বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে
(গ) আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত ব্যক্তি হতে পারবে না
আবেদনের সময় তফসিল-১ এর ফরমে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, নিবন্ধন ফি জমাদানের রসিদ এবং তফসিল-৪ অনুযায়ী ফিটনেস সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই-বাছাইপূর্বক নিবন্ধন দেবে।
৩. একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে একটিই ই-রিকশা
এটি এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা।
– একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একটির বেশি ই-রিকশার নিবন্ধন দেওয়া হবে না।
– একটি সিটি কর্পোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য কোনো সিটি কর্পোরেশনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চলতে পারবে না।
– নিবন্ধনের মেয়াদ হবে ৫ বছর। প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য QR কোডযুক্ত ডিজিটাল নিবন্ধন নম্বর ও তথ্য প্লেট প্রদান করা হবে যা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।
৪. বুয়েটের মানদণ্ড ও ১২ বছরের আয়ু
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃক নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য মোতাবেক ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকলে কোনো ই-রিকশার নিবন্ধন দেওয়া হবে না। প্রতিটি ই-রিকশার ইকোনমিক লাইফ হবে ১২ বছর। ইলেকট্রনিক লাইফ শেষ হওয়ার পর নম্বর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
৫. কোথায় চলতে পারবে না
– জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও করিডোর এবং প্রশাসন কর্তৃক সময় সময় নিষিদ্ধ আরোপিত সড়কে চলতে পারবে না।
– ই-রিকশা ফুটপাতে চলাচল করতে পারবে না।
– ই-রিকশা চালক সর্বদা সড়কের বাম লেন অনুসরণ করে চলাচল করবে।
– ড্রাইভিং করা অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নেশা বহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং এবং লেন পরিবর্তন করা যাবে না।
৬. যাত্রী, মালামাল ও শব্দের সীমা
– চালক ব্যতীত ২ জনের অধিক যাত্রী পরিবহন করা যাবে না।
– যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ব্যতীত অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
– ৪০ ডেসিবেলের অধিক তীব্রতাসম্পন্ন হর্ন ব্যবহার করা যাবে না।
– স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় বা জনবহুল স্থানে সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
৭. ট্রাফিক ও রুট পরিকল্পনা
প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সাথে পরামর্শ করে জিওলজিক্যাল বা অনুমোদিত এলাকায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করবে। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রুট ভাগ করে জোনভিত্তিক এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে। ট্রাফিক বিভাগ ও ট্রাফিক পুলিশের সাথে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে।
৮. চার্জিং ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা
– কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত ও সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স প্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজে চার্জ দিতে হবে। বাসাবাড়ির সংযোগ বা অবৈধভাবে চার্জ দেওয়া যাবে না।
– পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী পুরাতন ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলা যাবে না। অনুমোদিত ডিলার বা ভাঙারীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
– কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগের সহিত পরামর্শ করে পার্কিং ও চার্জিং এর উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থা করবে।
৯. উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন
ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের জন্য ৬ সদস্যের সুপারিশ প্রদান কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক হবেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন অনুবিভাগ), সদস্য হবেন সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি, বুয়েটের অভিজ্ঞ প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি এবং সদস্য সচিব হবেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব।
১০. শাস্তি ও দণ্ড
নিবন্ধন ব্যতীত ই-রিকশা চালানো, অনুমোদিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন, নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে চালানো, ফিটনেসবিহীন চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দুর্ঘটনায় আইনি দায়বদ্ধতা আরোপ করা হবে।
সরকার জানিয়েছে, এই বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখের এস.আর.ও. নং ৩৮২-আইন/২০২৩ মূলে জারিকৃত সিটি কর্পোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৩ রহিত করা হলো।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানিয়েছে, গেজেটের আলোকে শীঘ্রই খুলনা মহানগরীতে ই-রিকশার জরিপ ও নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হবে।