দীর্ঘ প্রায় ১৩ মাস (১ বছর ১ মাস) কারাভোগের পর অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা ৮ মিনিটের দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি লাভ করেন। মুক্ত হওয়ার পর তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন, আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সাবেক এই মেয়র আগামীতে আবারও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার শিরিন আক্তার আইভীর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বুধবার সন্ধ্যায় সাবেক মেয়রের জামিনের সব আইনি নথিপত্র কারাগারে পৌঁছায়। কারা কর্তৃপক্ষ কাগজপত্রের সত্যতা ও সুনির্দিষ্ট আদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখে যে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো নতুন আটকাদেশ বা পরোয়ানা নেই। এরপর রাত ১০টা ৮ মিনিটে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
যেভাবে মিলল মুক্তি (আইনি নথিপত্র):
কারা অধিদপ্তর ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় সর্বমোট ১২টি মামলা চলমান ছিল। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় তাঁর মুক্তি নিশ্চিত হয়।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) জান্নাত উল ফরহাদ জানান, বুধবার হাইকোর্টের ক্রিমিনাল মিস নং-১৩৪১২/২৬ এবং নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্মারক অনুযায়ী জামিনের চূড়ান্ত আদেশ কারাগারে পৌঁছায়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সূত্র অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের ৯টি মামলায় তাঁর জামিনের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল থাকায় ওনার মুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা থাকেনি।
ভবিষ্যতে নির্বাচন লড়ার পরিকল্পনা:
কারা ফটক থেকে বের হওয়ার পর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সরাসরি একটি গাড়িতে উঠে তাঁর নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের নিজ বাসভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক কথা বলেননি।
তবে তাঁর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যেসব মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। তিনি রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই সমানভাবে চালিয়ে যাবেন। পাশাপাশি ওনার আইনজীবী হিসেবে আমি নিশ্চিত করছি, ভবিষ্যতে আবারও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পূর্ণ পরিকল্পনা রয়েছে সেলিনা হায়াৎ আইভীর।”
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরিক্রমা:
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৯ মে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাকে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে পাঠানো হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ফতুল্লা ও সদর মডেল থানায় দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে একের পর এক গ্রেপ্তার (শোন অ্যারেস্ট) দেখানো হতে থাকে।
সর্বশেষ গত ১০ মে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ আইভীর বিরুদ্ধে থাকা ১০টি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন। পরবর্তীতে বাকি ২টি মামলাতেও উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন তিনি। বারবার একই প্রকৃতির মিথ্যা মামলায় তাঁকে জড়ানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইভীর পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনও করা হয়েছিল, যার রুল বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) গঠিত হওয়ার পর তিনি দেশের প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন এবং টানা তিনটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ইতিহাস গড়েন।