দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আমূল পরিবর্তন, যুগান্তকারী স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবার সমন্বিত ‘ফ্যামিলি ট্রি’ (Family Tree) নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক নেটওয়ার্কিং সিস্টেম চালুর মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সরকারের সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমুখী কর্মসূচিকে একটি একক সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হবে। এর ফলে একই ব্যক্তি বা পরিবারে ভিন্ন ভিন্ন ভাতা পাওয়ার দ্বৈততা বা ‘ডাবল বুকিং’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সরকারের এই নতুন দূরদর্শী পরিকল্পনা ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন।
ইউরোপ-আমেরিকার আদলে ‘সোশ্যাল কার্ড’:
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, ইউরোপ বা আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর আদলে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সোশ্যাল কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এই প্রস্তাবিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভান্ডার। এটি চূড়ান্তভাবে চালু হলে একটি একক ডিজিটাল আইডির অধীনে মুহূর্তেই জানা যাবে দেশের কোন পরিবার রাষ্ট্র থেকে ঠিক কী কী সুবিধা পাচ্ছে। ফলে মাত্র একটি ডিজিটাল ফ্যামিলি কার্ড ও কিউআর (QR) কোডের মাধ্যমেই প্রান্তিক মানুষ সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা সেবা ও ভাতার সুবিধা পেয়ে যাবেন।
জুনের মধ্যে ৮০ হাজার কার্ড ও পাইলটিং:
আগামী জুন ২০২৬-এর মধ্যে দেশের প্রায় ৮০ হাজার মানুষকে এই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রতি পর্যায় বা ফেজ ধরে এই কর্মসূচি ক্রমান্বয়ে (গ্র্যাজুয়ালি) অগ্রসর হচ্ছে এবং জুনের মধ্যেই এর মূল পাইলটিং কার্যক্রম শেষ হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “মাঠপর্যায়ের ছোটখাটো কারিগরি ও বাস্তব ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সেগুলোর স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধানের জন্যই বর্তমানে এই পাইলটিং করা হচ্ছে।”
মাসিক ভাতা ২৫০০ টাকা, ত্যাগ করতে হবে পুরোনো ভাতা:
নতুন এই ফ্যামিলি কার্ডের জন্য মাসিক ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে সরকারের ‘ডাবল বুকিং’ বন্ধের কড়া নিয়ম অনুযায়ী, যেসব নাগরিক বর্তমানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার বয়স্ক, প্রতিবন্ধী কিংবা বিধবা ভাতা পাচ্ছেন, তাঁরা যদি নতুন এই উচ্চ অঙ্কের কার্ডটি নিতে চান, তবে আগের কম অঙ্কের ভাতাটি ‘সারেন্ডার’ বা লিখিতভাবে ত্যাগ করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, ভবিষ্যতে কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডসহ রাষ্ট্রীয় সব সামাজিক নিরাপত্তা কার্ডকে একীভূত বা মার্জ করতে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হবে।
উপকারভোগী নির্বাচনে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি:
সঠিক ও প্রকৃত দরিদ্র ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের টাকা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে প্রতিদিন ডেটা ফাইন্ডিং ও স্ক্রিনিং করা হচ্ছে উল্লেখ করে ফারজানা শারমীন বলেন, “গত ১৬ মে চাঁদপুর থেকে এই ঐতিহাসিক কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আগামী জুনে তৃতীয় ধাপে দেশের আরও ১৮টি উপজেলায় এ কর্মসূচি একযোগে শুরু করা হবে।”
তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুপারিশে নয়, বরং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ বা পিএমটি (PMT) মেথডে স্কোরিং বা পয়েন্ট দেওয়ার মাধ্যমে এই কার্ডের জন্য প্রকৃত যোগ্য ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচন করা হচ্ছে।
অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স:
মাঠপর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা ও বিতরণ নিয়ে কিছু বিচ্ছিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার এবং উপকারভোগী সাধারণ মানুষের মাঝখানে কোনো ধরণের মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের উপস্থিতি সহ্য করা হবে না। যেখানেই অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা কার্ড দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, দ্রুত সেখানে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে শতভাগ অটল রয়েছি।”