আবদুল্লাহ আল মাসুম, মিঠাপুকুর {রংপুর} প্রতিনিধি
১৩ জুলাই ২০২৬, ৩:৩১ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মিঠাপুকুরে কলেজছাত্রী খুশীর রহস্যজনক মৃত্যু: অপমৃত্যুর আড়ালে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের লোমহর্ষক ক্লু উন্মোচন

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রামরায়েরপাড়া এলাকার দ্বাদশ শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী কুলসুমা আক্তার খুশীর (১৮) রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে বেরিয়ে এসেছে এক পরিকল্পিত ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে অপমৃত্যু বা UD (Unnatural Death) মামলা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নতুন ডিজিটাল আলামত, নিখুঁত টাইমলাইন, কল হিস্ট্রি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ প্রমাণ করে যে, এটি একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক নরহত্যা ও জোরপূর্বক গর্ভপাতজনিত মৃত্যুর ঘটনা।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খুশি গর্ভবতী হয়ে পড়লে এক পর্যায়ে মূল অভিযুক্ত মো: মারুফ বিল্লাহ (২৮) তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে শুরু করে। তাদের উদ্ধারকৃত মোবাইল চ্যাট হিস্ট্রি ও ডিজিটাল আলামত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খুশি তার মাতৃত্বের অধিকার ও সামাজিক স্বীকৃতির দাবি জানালে মারুফ তা প্রত্যাখ্যান করে এবং উল্টো মেয়েটিকে মানসিক চাপ দিতে থাকে।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ১৮ জুন প্রধান অভিযুক্ত মো. মারুফ বিল্লাহ তার মা রিক্তা বেগম, মামা মিলন মিয়া ও অন্যান্য সহযোগীদের সহযোগিতায় খুশীকে ফুসলিয়ে মিঠাপুকুরের চিহ্নিত দালাল লিপির বাড়িতে নিয়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে সুমন ও আরিফুল নামে দুই যুবক অভিযুক্ত মারুফের বাড়িতে গিয়েছিলেন, যা প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীর বড় বোন সালমা বেগম। সেখানে লিপি ও মারুফ মিলে খুশীর শরীরে অননুমোদিত গর্ভপাত করানোর মেডিসিন ‘মিনিকিট’ (Minikit) প্রয়োগ করে। মিনিকিট সেবনের পরপরই খুশীর জরায়ুতে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে।

অবস্থা বেগতিক দেখে প্রেমিক মারুফ তাকে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও অভ্যন্তরীণ বিষক্রিয়ার কারণে খুশীর অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে জরুরি ভিত্তিতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করে। পরবর্তীতে রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে খুশি।

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত স্টাফ শহিদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, ঘটনার দিন রহস্যময়ী দালাল লিপিকেও ওই মেডিকেল প্রাঙ্গণে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। তবে ঘটনার পর অপরাধের গভীরতা টের পেয়ে মূল অভিযুক্ত মারুফের পাশাপাশি দালাল লিপিও সেদিন থেকে সম্পূর্ণ পলাতক রয়েছে। লিপি ও মারুফ সহ এই চক্রের প্রত্যেকেই বর্তমানে গা ঢাকা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে মারুফের চরিত্র ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আরও কিছু বিস্ফোরক তথ্য মিলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কোচিং শিক্ষক প্রতিবেদককে জানান, মারুফ মূলত একটি নকল সিন্ডিকেটের ওস্তাদ এবং সুন্দরী ছাত্রীদের টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলাই ছিল তার কাজ। খুশির মোবাইল ফোন থেকে তাদের গভীর সম্পর্কের অসংখ্য ছবি ও চ্যাট হিস্ট্রিও উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় দোকানদার সুমন জানান, মারুফ নিজের মুখে সুমনের কাছে খুশীর সাথে তার গভীর প্রেমের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিল।

প্রাপ্ত নতুন এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, মারুফের বড় ভাই মো: মিল্লাদুন এই অপরাধের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী। চ্যাট লিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মিল্লাদুন মেয়েটিকে বিয়ের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আসছিল এবং তার মানসিক চাপ বা “টেনশন” কমানোর অজুহাতে চিকিৎসকের কোনো পরামর্শ ছাড়াই ‘Frenxit’ (ফ্রেঙ্কসিট) নামক মনোদৈহিক ওষুধ সাজেস্ট করতো ও নিয়মিত খাওয়াতো। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিষপ্রয়োগের সমতুল্য অপরাধ। অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত মারুফের বড় ভাই মিল্লাদুনের একাধিক ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে ঘটনার দিন খুশীর বান্ধবী বৃষ্টির সাথে মুঠোফোনে কথা বলেই খুশী বাড়ি থেকে বের হন। খুশীর কল হিস্ট্রি অনুযায়ী সে সেদিন বৃষ্টিকে ৩ বার কল দিয়েছিল। এই বিষয়ে বৃষ্টিকে প্রশ্ন করা হলে সে বলে, “খুশী নিজেই কল দিয়ে রিকোয়েস্ট করে বলে লাউডে কথা বলতে, যা শুনে খুশী বাইরে যেতে পারে। তাদের প্রেমের সম্পর্কের ব্যাপারে আমার জানা নেই।” ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মারুফের বন্ধু রাকিব ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত মারুফকে এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছে। তবে এ বিষয়ে রাকিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে সে দাবি করে, ২০১৯ সাল থেকে মারুফের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

বর্তমানে মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ হিসেবে ‘Drug poisoning’ বা বিষক্রিয়ার কথা বলা হলেও, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও নিষিদ্ধ ড্রাগের প্রভাবেই এই মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই জান্নাত জানান, “লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ভিসেরা ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট আসলে মৃত্যুর প্রকৃত ও আইনি কারণ সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।”

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

Spotify Review 2026

১

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

২

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৩

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৪

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৫

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৬

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৭

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

৮

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

৯

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১০

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১১

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১২

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৩

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৪

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৫

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৬

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৭

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

১৮

নাগেশ্বরীতে জুয়ার আসর থেকে যুবশক্তির নেতা আটক, ঘণ্টাখানেক পর মুচলেকায় মুক্তি

১৯

ফুলবাড়ীতে ডিবির অভিযানে ১০৩ পিস ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার

২০