রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা মামলায় আদালতে দাঁড়িয়ে প্রথম দিনের সাক্ষ্য দিয়েছেন তার মা পারভীনা আক্তার। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঘাতক দম্পতিকে দেখিয়ে বুকফাটা আর্তনাদে তিনি বলেন, “আমি বারবার স্বপ্নাকে কেঁদে বলি—বইন দরজাটা খোল, দরজাটা খোল। আমি তোকে কিছু বলব না। কিন্তু সে খোলে নাই।” পরবর্তীতে দরজা ভেঙে ভেতরে মেয়ের খণ্ডিত মরদেহ দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে আদালতকে জানান।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে অশ্রুসজল চোখে এই রোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক বর্ণনা দেন নিহত শিশুর মা।
(উল্লেখ্য: সংবাদের ভেতরের বিবরণীতে মামলার তারিখ ভুলবশত ‘মঙ্গলবার ৩ জুন’ উল্লেখ থাকলেও, চলতি বছরের ক্যালেন্ডার ও আদালতের কার্যসূচি অনুযায়ী আজ ‘মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬’)
কাঠগড়ায় ঘাতক দম্পতি, একে একে বাবা-মায়ের সাক্ষ্য:
আজ আদালতে মামলার প্রথম ও দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে যথাক্রমে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীনা আক্তার সাক্ষ্য প্রদান করেন। বেলা ১১টা ৩ মিনিটের দিকে পারভীনার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কড়া নিরাপত্তায় কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।
আদালতে পারভীনা আক্তার জানান, গত ১৯ মে সকালে তিনি যখন রান্না করছিলেন, তখন তাঁর ছোট মেয়ে রামিসা বড় বোনের সাথে তার চাচার বাসায় যাওয়ার জেদ ধরে। তিনি বারণ করার পর বড় মেয়ে রাইসা একাই চাচার বাসায় চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে একটি বাচ্চার কান্নার চিৎকার শুনতে পান তিনি। তবে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল ও স্বপ্নার কোনো সন্তান না থাকায় বিষয়টি প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরবর্তীতে বড় মেয়ে রাইসা একা ফিরে এলে এবং রামিসা নিচে নেই জানতে পেরে তিনি ব্যাকুল হয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
দরজার সামনে জুতা দেখেই সন্দেহ:
ভবনের বিভিন্ন তলায় খুঁজেও রামিসাকে না পেয়ে তিনতলায় সোহেলদের বন্ধ দরজার সামনে মেয়ের একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন পারভীনা আক্তার। তখন তাঁর মনে পড়ে, কিছুক্ষণ আগে শোনা বাচ্চার চিৎকারটি হয়তো তাঁর নিজের মেয়েরই ছিল।
তিনি অনবরত দরজা ধাক্কালেও ভেতর থেকে কেউ সাড়াশব্দ দেয়নি। পরে ভবনের অন্যান্য বাসিন্দা, আশপাশের লোকজন ও তাঁর স্বামী অফিস থেকে দ্রুত ছুটে আসেন। সবাই মিলে প্রায় ২০-২৫ মিনিট ধরে দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে দরজার গোল ‘বোল্ড লক’ ভেঙে ফেলা হলে সেই ভাঙা লকের ছিদ্র দিয়ে দেখা যায় বাথরুমের ভেতর ছোপ ছোপ রক্ত।
ভেতরে হাঁটছিল স্বপ্না, বাথরুমে বালতিতে মাথা:
রামিসার মা জানান, লকের ছিদ্র দিয়ে তিনি যখন বাইরে কাঁদছিলেন, তখন ঘরের ভেতর আসামি স্বপ্নাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে দেখেন। বাইরে থেকে বারবার মিনতি করলেও স্বপ্না দরজা খোলেনি।
পরবর্তীতে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই ভেসে আসে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। পারভীনা বলেন, “ভেতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায় আর দেহ আরেক জায়গায়। মাথা বাথরুমের বালতিতে রাখা, আর দেহ আসামিদের রুমের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।” এরপর পুলিশ এসে লাশ ও আলামত উদ্ধার করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলুর প্রশ্নের জবাবে মা পারভীনা কাঠগড়ায় দাঁড়ানো স্বপ্নার দিকে হাত উঁচিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন। বেলা ১১টা ২২ মিনিটে তাঁর সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁকে জেরা করেন এবং ১১টা ২৬ মিনিটে জেরা সম্পন্ন হয়।
নেপথ্যে বিকৃত মানসিকতা ও মাদক:
তদন্ত শেষে পুলিশের দাখিল করা চার্জশিটে বলা হয়েছে, প্রধান আসামি সোহেল রানা মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার দিন শিশু রামিসাকে বাথরুমে টেনে নিয়ে সে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। শিশুটি চিৎকার করায় এবং বাবা-মাকে বলে দেওয়ার কথা বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা ও হাত কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে সে। আর এই ভয়াবহ অপরাধের পর লাশ গুম করা, আলামত গোপন এবং ঘাতক স্বামী সোহেলকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার।