বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই এখন যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। প্রায় ৮০ লাখ মানুষের রুটি-রুজি ও বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের যাতায়াত এই খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত নকশা এবং সড়ক নিরাপত্তার অভাবে দিন দিন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাহনটি একেবারে বন্ধ না করে আধুনিক ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের জোর দাবি উঠেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত অটোরিকশা ও অটোভ্যান দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৬০৩ জন নিহত হয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশায় উচ্চক্ষমতার মোটর ও ভারী ব্যাটারি ব্যবহার করে গতি ৫০ কিলোমিটারে পৌঁছালেও, ব্রেকিং ব্যবস্থা হিসেবে রাখা হয় সাধারণ প্যাডেল রিকশার উপযোগী সস্তা প্রযুক্তি। ৩০০ কেজির দ্রুতগতির এই যানকে ৩০ টাকার প্রযুক্তির ব্রেকের ওপর ছেড়ে দেওয়াই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমাধান কেবল উচ্ছেদ বা রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে না। বাস, ট্রাক বা প্রাইভেটকার দুর্ঘটনার শিকার হলে যেমন সেগুলো বন্ধ করা হয় না, তেমনি লাখো শ্রমজীবী পরিবারের জীবিকা ও কোটি কোটি টাকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ধ্বংস না করে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
এই খাতকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে ১০ দফা আধুনিক সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে:
১. ইউনিক নম্বর ও ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন।
২. চালকের জন্য ন্যূনতম প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক জ্ঞান ও লাইসেন্স নিশ্চিত করা।
৩. হাইড্রোলিক বা গতি-ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নত ব্রেক বাধ্যতামূলক করা।
৪. কারখানাভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড ও মানসম্মত বডি ডিজাইন অনুমোদন।
৫. স্পিড গভর্নরের মাধ্যমে এলাকাভেদে সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ।
৬. জাতীয় মহাসড়ক এড়িয়ে নির্দিষ্ট স্থানীয় ও শহুরে রুট নির্ধারণ।
৭. ব্রেক, ব্যাটারি ও স্টিয়ারিংয়ের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা।
৮. অবৈধ চার্জিং বন্ধ করে নিরাপদ ও সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তিভিত্তিক চার্জিং অবকাঠামো গঠন।
৯. পুরোনো প্রযুক্তিকে ডাম্পিং না করে ধাপে ধাপে রেট্রোফিটিং ও আপগ্রেডিং করা।
১০. রাজস্ব ও সরকারি নীতিমালার আওতায় এনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান।
শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি রক্ষা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল দমনমূলক পথ না হেঁটে বিজ্ঞানভিত্তিক, নীতিভিত্তিক ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।