কালান্তর নিউজ ডেস্ক
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ২:০৯ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

জন্মের শতবর্ষেও অচিহ্নিত ভাষাশহীদ রফিকের কবর, ৭৫ বছরেও মেলেনি স

মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষার্থী রফিক উদ্দিন আহমেদ। পুলিশের গুলিতে মাত্র ২৫ বছর বয়সে প্রাণ হারানো এই ভাষাশহীদের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে গতকাল শুক্রবার (৩০ অক্টোবর)। অথচ ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের প্রায় ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি তাঁর কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান। ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত এই ভাষাশহীদের সমাধি আজও অচিহ্নিত।

১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিক উদ্দিন আহমেদ। শৈশব ও কৈশোর কাটে নিজ গ্রামেই। ১৯৪৯ সালে স্থানীয় বায়রা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে। তবে পারিবারিক প্রয়োজনে সেখানে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে বাবার মুদ্রণ ব্যবসায় যুক্ত হন। পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ভর্তি হন তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে।

তখন পূর্ব বাংলাজুড়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ ও আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। সেই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হন জগন্নাথ কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী রফিকও।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পাকিস্তান সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নামেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এ সময় পুলিশের একটি গুলি সরাসরি রফিকের মাথায় বিদ্ধ হয়। মাথার খুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ১৭ নম্বর কক্ষের পূর্ব পাশে পড়ে ছিল রফিকের নিথর দেহ। গুলির আঘাতে তাঁর মাথার খুলি ভেঙে মস্তিষ্কের অংশ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। পরে আন্দোলনকারীরা মরদেহ উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি হলের পেছনের বারান্দায় নিয়ে যান। সেখান থেকে মরদেহ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় পুলিশ।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে রফিকের মরদেহের আলোকচিত্রও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের আলোকচিত্রী আমানুল হক পুলিশের কঠোর নজরদারি এড়িয়ে হাসপাতালের পেছনের একটি কক্ষে গিয়ে তাঁর মরদেহের ছবি ধারণ করেন। পরবর্তী সময়ে ছবিটি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুলিশের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। পত্রিকার মুদ্রিত কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে ছবিটি প্রকাশ্যে এলে তা ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।

তবে রফিকের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্পষ্ট হলেও তাঁর শেষ ঠিকানার অবস্থান আজও অনিশ্চিত। ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে কঠোর সামরিক পাহারায় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। সে সময় কবরের কোনো স্থায়ী চিহ্ন রাখা হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁর সমাধির সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

যাঁর রক্তে রচিত হয়েছিল মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, তাঁর সমাধিস্থল আজও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকলেও আজিমপুর কবরস্থানের কোথায় তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত, তা এখনো অজানা।

ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় অসামান্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে রফিক উদ্দিন আহমেদকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে জন্মস্থান পারিল গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রফিকনগর। তবে জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হলেও তাঁর সমাধির সুনির্দিষ্ট অবস্থান আজও অশনাক্ত রয়ে গেছে।

এদিকে ভাষাশহীদ রফিকের স্মৃতি জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় উচ্চারিত হয়ে আসছে তাঁর নাম।

ভাষা আন্দোলনে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীর আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি একাডেমিক ভবনের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষাশহীদ রফিক ভবন’। বর্তমানে ভবনটিতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই ভবন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন রফিক উদ্দিন আহমেদ। তাঁর আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় বাংলা।

জন্মের শতবর্ষ পেরিয়ে ভাষাশহীদ রফিকের আত্মত্যাগ বাঙালির ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছে। অথচ যে তরুণ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান আজও অজানা। ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকলেও শেষ ঠিকানায় কোনো চিহ্ন নেই ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদের।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এইচএসসি ফেল করা ৪ লাখ শিক্ষার্থীর ফের পরীক্ষা এক মাসে!

১

ফিরছে গ্রাম সরকার, বিএনপির ত্যাগীদের মূল্যায়নের ভাবনা

২

রংপুর-১ আসনে শিক্ষার আলোয় বড় জয়: দুই ভিন্ন উদ্যোগে বরাদ্দ মিললো ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা!

৩

জন্মের শতবর্ষেও অচিহ্নিত ভাষাশহীদ রফিকের কবর, ৭৫ বছরেও মেলেনি স

৪

খুলনার মজিদ সরণিতে সাইনবোর্ড চুরির অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবসায়ীরা

৫

শাল্লায় জুমার নামাজের পর গ্রাম আদালতের সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ

৬

কুষ্টিয়া পুলিশ সুপারের সঙ্গে পূজা উদযাপন পরিষদের বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়

৭

প্রবীণ দিবসে নোবিপ্রবি উপাচার্যকে সংবর্ধনা

৮

কিশোরগঞ্জে ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত

৯

পাবনায় সোনাপাতিল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ৬ জনের মৃত্যু, আহত ২

১০

বাঘারপাড়ায় লং মার্চ সফল করতে জামায়াতের ঝটিকা মিছিল

১১

জিতু হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফরিদপুরে মানববন্ধন

১২

দৌলতপুরে দখলদারদের খুঁটির জোর কোথায়? প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

১৩

নিরাপদ সুন্দরবনের দাবিতে গাবুরায় বনজীবীদের বিক্ষোভ, ৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

১৪

সিটি কর্পোরেশনে ই-রিকশার বৈধতা, লাগবে QR কোড, একজনের একটাই থাকবে – গেজেট প্রকাশ

১৫

জুমুআর খুতবার সময় নামাজের বৈঠকের মতো বসা কি বাধ্যতামূলক?

১৬

বেলকুচিতে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় যুবকের মরদেহ উদ্ধার, আত্মহত্যার অভিযোগ

১৭

খুলনার রাজনীতির গিরগিটি – জাতীয় পার্টি থেকে এনসিপি, এনসিপি থেকে বহিষ্কার, শেষ ঠিকানা জনতার দল!

১৮

বেগম খালেদা জিয়া: আপসহীন নেতৃত্ব, আত্মমর্যাদা ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অনন্য প্রতীক-ইঞ্জি. কাজী সাইমুম সিরাজ

১৯

স্কুলের পোশাকে হাতে আইসক্রিম, ছবির সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজ ডা. জোবাইদা রহমান

২০