৩ নভেম্বরের পর বন্ধ হবে উৎপাদন, ৫০৯ শ্রমিককে ইতোমধ্যে বিদায়; পাওনা পরিশোধের সময়সীমা ১৫ নভেম্বর
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) দেশের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কারখানার পুরোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে কারখানাটিতে কর্মরত প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকবে। এরপর কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে ৫০৯ জন শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি শ্রমিকদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, ভাঙার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
কারখানাটির পুরোনো ভবনটি দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ভবনটির নিরাপত্তা পরীক্ষা করায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) বিশেষজ্ঞরা ভবনটি ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন।
শ্রমিকদের জীবন, কারখানার যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ভবনটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্ধারিত শর্ত পূরণেও ব্যর্থ হচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
৫০৯ শ্রমিকের বিদায়, বাকিদের নিয়েও অনিশ্চয়তা
প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের কারখানাটিতে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকের সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার।
কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ৫০৯ জন শ্রমিককে বিদায় করা হয়েছে। তাঁদের পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি অভিজ্ঞতার সনদও দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ খুঁজতে পারেন।
অন্যদিকে অবশিষ্ট প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিকের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন ভবনে উৎপাদন শুরু হলে আগের শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। পাশাপাশি ইপিজেডের অন্য কারখানায় তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির চেষ্টাও থাকবে।
১৫ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধ হবে পাওনা
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শ্রমিক-কর্মচারীদের সব ধরনের পাওনা পরিশোধ করেই কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করা হবে। এ জন্য আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
শ্রমিকদের আইন অনুযায়ী প্রাপ্য বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নতুন ভবন নির্মাণে লাগতে পারে এক বছর বা তার বেশি
চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. শরিফুল ইসলামের বরাত দিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ভবন নির্মাণ এবং সেখানে পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। নতুন ভবন নির্মাণের পর উৎপাদন শুরু হলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিল্প পুলিশ-৩ (চট্টগ্রাম)-এর পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানিয়েছেন, ভবনটির বয়স ও নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু
প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড প্যাসিফিক গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৪ সালে এম নাছির উদ্দিনের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি দেশের তৈরি পোশাক ও ডেনিম পণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
প্যাসিফিক গ্রুপের বিভিন্ন কারখানায় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন। তবে বর্তমান সিদ্ধান্তটি প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের নির্দিষ্ট একটি কারখানা নিয়ে। গ্রুপের সব কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এমন তথ্য সঠিক নয়।
শ্রমিকদের চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছেড়ে যেতে হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে সহকর্মীদের আলিঙ্গন করে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে কয়েকজন শ্রমিককে।
একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করা শ্রমিকদের কাছে কর্মস্থলটি শুধু জীবিকার জায়গা নয়, বরং তাঁদের জীবনের একটি বড় অংশ। হঠাৎ কর্মস্থল হারানোর ঘটনায় পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেকে।
সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ একদিকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অন্যদিকে হাজারো শ্রমিকের জীবিকা ও কর্মসংস্থান এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব শ্রমিকের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।