দেশের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
তবে এ কর্মসূচির জন্য তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি, কার্ড উৎপাদন সরঞ্জাম কেনা এবং পরামর্শক নিয়োগে বিপুল অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইমপ্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ (SSPIRIT) প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে ২ হাজার ৬৯৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অর্থ বিভাগের ‘সোশ্যাল প্রটেকশন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষার জন্য সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। তবে প্রকল্প দুটির ব্যয় ও উদ্দেশ্যের মধ্যে কোথায় সমন্বয় রয়েছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
SSPIRIT প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৯০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬৯৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির আওতায় সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, দরিদ্র পরিবারের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্যভুক্ত সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লাখ।
প্রকাশিত প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্যয় খাত হলো:
এ হিসাবে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পরামর্শক মিলিয়ে বরাদ্দ প্রায় ২২৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এত বড় অঙ্কের পরামর্শক ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের সেবা নেওয়া হবে, কীভাবে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কাজের ফলাফল কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের জন্য অর্থ বিভাগ ‘সোশ্যাল প্রটেকশন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন’ নামে পৃথক প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা বাজেট প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ প্রকল্পের মূল কাজ হলো সমন্বিত তথ্য সংগ্রহব্যবস্থা তৈরি, ডেটাবেজ পরিচালনা এবং বিভিন্ন সরকারি ও সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন।
প্রকাশিত তথ্যে প্রকল্পটির ব্যয় ২১৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং পরামর্শক খাতে ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।দুটি প্রকল্পের কাজের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ডেটাবেজ তৈরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মতো ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মিল রয়েছে।
তবে শুধু এ ধরনের মিল থাকলেই একই কাজ দুবার করা হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রকল্প দুটির কার্যপরিধি, ব্যয়ের খাত এবং দায়িত্ব বণ্টনের বিস্তারিত তুলনা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ হিসাব: SSPIRIT প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ২ হাজার ৬৯৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং অর্থ বিভাগের প্রকল্পের ব্যয় ২১৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। দুটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ২ হাজার ৯১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
তাই ২ হাজার ১০ কোটি টাকাকে এ দুটি প্রকল্পের মোট ব্যয় বলা সঠিক নয়। ওই অঙ্কটি নির্দিষ্ট ব্যয় খাতের সমষ্টি হলে তার পৃথক হিসাব ও উৎস প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেজ (NHD) প্রকল্পের মাধ্যমে আগে থেকেই পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ প্রকল্পে ব্যয় ও তথ্যভান্ডারের কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন নতুন করে দরিদ্র পরিবার শনাক্ত ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের জন্য ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ায় আগের তথ্যভান্ডার কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে, কোন তথ্য হালনাগাদ করা প্রয়োজন এবং নতুন করে তথ্য সংগ্রহের যৌক্তিকতা কী, তা পরিষ্কার করা জরুরি।
একইভাবে, পরামর্শক, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহে ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের পরিমাপযোগ্য ফলাফল পাওয়া যাবে, সেটিও জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির লক্ষ্য দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনিক ব্যয়, তথ্য সংগ্রহ ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় কত অর্থ প্রয়োজন, তা নিয়ে স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।
পাইলট পর্যায়ে কার্ড বিতরণ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যয়ও আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা নীতি সহায়তা কর্মসূচির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইলট পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন।
ওই পর্যায়ের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরাসরি আর্থিক সহায়তায় এবং ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা তথ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও কার্ড উৎপাদনসহ বাস্তবায়ন কার্যক্রমে রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ হিসাব থেকে বোঝা যায়, কর্মসূচি পরিচালনায় সরাসরি ভাতার বাইরেও ব্যয় রয়েছে। তবে পাইলট পর্যায়ের ব্যয় ও দেশব্যাপী কার্যক্রমের ব্যয় এক নয়। তাই পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির ব্যয় মূল্যায়নে পৃথক হিসাব প্রয়োজন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এ কাজে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োজিত রয়েছেন।
ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করে উপযুক্ত সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহারের ওপর।
প্রশ্ন হলো, আগের ডেটাবেজের তথ্য কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে? দুটি প্রকল্পের মধ্যে কাজের পুনরাবৃত্তি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? পরামর্শক ও প্রযুক্তিগত খাতে বড় অঙ্কের ব্যয়ের বিপরীতে কী ফলাফল পাওয়া যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর, প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের বিস্তারিত প্রকাশ এবং স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হবে বরাদ্দের অঙ্ক দিয়ে নয়, বরং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের হাতে সহায়তা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, তা দিয়ে।