সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার বড়ধুল ইউনিয়ন পরিষদে জি.আর. সরকারি চাল বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাংবাদিক মহল।
গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বড়ধুল ইউনিয়ন পরিষদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায়, দুস্থ, এতিম ও প্রতিবন্ধীদের মাঝে মানবিক সহায়তা হিসেবে জি.আর. খাদ্যশস্যের চাল বিতরণের কথা ছিল।
সাংবাদিকদের দাবি, সকাল ১১টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কয়েকজন নারী-পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত ট্যাগ অফিসার মোঃ শরিফুল ইসলামকে চাল বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি সকাল ৯টা থেকে সেখানে অবস্থান করছেন, কিন্তু তখনও চাল বিতরণের কোনো কার্যক্রম দেখতে পাননি।
কিছুক্ষণ পর ইউপি সদস্য আয়নাল হক প্রামানিক একটি ব্যানারসহ ৫০ থেকে ৬০ জন স্লিপধারীকে ডেকে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে চাল বিতরণ উদ্বোধন করেন। ওই ৫০-৬০ জন চাল নেওয়ার পর আর কোনো স্লিপধারীকে দেখা যায়নি বলে দাবি করা হয়।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরিষদের পাশেই ১০-১৫ জন কিশোরকে দেখা যায়, যাদের কাছে ৩-৪টি করে স্লিপ ছিল। তারা বস্তা নিয়ে চাল সংগ্রহ করছিল। একই ব্যক্তি বারবার ৫-৭ বার করে চাল নেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। বিষয়টি দেখে ট্যাগ অফিসার মোঃ শরিফুল ইসলাম তাদের এভাবে চাল নিতে নিষেধ করেন। তবে এরপরও তারা চাল নেওয়া অব্যাহত রাখে বলে অভিযোগ করা হয়।
সাংবাদিকরা এসব দৃশ্য ভিডিও করতে গেলে তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয় এবং এটি ইউনিয়ন পরিষদের বিষয় বলে সাংবাদিকদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাল বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি দেখে ট্যাগ অফিসার মোঃ শরিফুল ইসলাম বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরিন জাহানকে অবগত করেন। পরে তিনি সেখান থেকে বেলকুচি উপজেলায় চলে যান বলে জানানো হয়।
এরপরও চাল বিতরণে অনিয়ম অব্যাহত থাকার অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিকদের দাবি, আয়নাল মেম্বারের বিক্রি করা স্লিপ দিয়ে চাল তুলে বস্তা বোঝাই করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সাংবাদিকরা প্রতিবাদ করলেও তাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
পরে বিষয়টি বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরিন জাহানকে জানানো হলে তিনি তাৎক্ষণিক ফোন করে চাল বিতরণ বন্ধ করে দেন। বিতরণ বন্ধের সময় ২৮৪ বস্তা চালের মধ্যে ১২৭ বস্তা চাল অবশিষ্ট ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি এবং ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পর সাংবাদিকরা চলে গেছেন—এমন অভিযোগকে মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, চাল বিতরণ বন্ধ হয় দুপুর ৩টার দিকে। ওইদিন পরিষদের প্রায় ৫০ গজ দূরে বড়ধুল ইউনিয়ন বিএনপির নির্বাচনী মতবিনিময় সভা ছিল। সেখানে সাংবাদিকরা প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপস্থিত থেকে সভার সংবাদ সংগ্রহ করেন।
পরে ফিরতি পথে নৌকা ঘাটে চাল বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হাজী আলতাফ হোসেন প্রামানিককে জানানো হয়। বিষয়টি শুনে তিনি বড়ধুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আছির উদ্দিন মোল্লাকে ফোন করেন এবং সাংবাদিকদের এ বিষয়ে সংবাদ করার কথা বলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এরপর ওইদিন রাতেই বিভিন্ন ওয়ানলাইন ফেসবুক পেজে চাল বিতরণে অনিয়মের ভিডিওচিত্রসহ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। পরদিন বুধবার সকালে বিষয়টি সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য মোঃ গোলাম আজমকে ফোনে এবং পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ শফিকুল ইসলাম শফিকে সরাসরি জানানো হয়।
দুপুরে রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ শেষে বেলকুচি উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মোঃ বনি আমিনের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়। তিনি ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিও ও সংবাদ প্রসঙ্গে বলেন, “ফেসবুকে যা দেখেছি এই পর্যন্তই যেন থাকে, আর কোনো পেপার-পত্রিকায় যেন কোনো নিউজ না হয়।” এরপর এ বিষয়ে আর কোনো সংবাদ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা।
তবে ওইদিন দুপুরের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে আয়নাল মেম্বার ও তার সহযোগীদের সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টি সামনে আসে। সাংবাদিকদের দাবি, সরকারি চাল বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ভিডিওচিত্রসহ সংবাদ প্রকাশের পর মূল ঘটনা আড়াল করতেই তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এ ঘটনায় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনিয়মের ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও সাংবাদিকদের দোষারোপ করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে এবং সাংবাদিকদের বক্তব্য না নিয়েই চাঁদাবাজির অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
সাংবাদিকরা আরও বলেন, সাংবাদিক যদি জাতির বিবেক বা আয়না হয়ে থাকে, তাহলে তারা সেই দায়িত্বই পালন করেছেন। সমসাময়িক সময়ে কারও কাছে বিষয়টি শুনতে খারাপ লাগলেও ভবিষ্যতের জন্য অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। একজনের অপরাধের কারণে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হোক, সেটি কাম্য নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
তাদের ভাষ্য, দলকে ভালোবাসেন বলেই অনিয়মের প্রতিবাদ করেছেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা ও বানোয়াট চাঁদাবাজির অভিযোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, বড়ধুল ইউনিয়নের আয়নাল মেম্বারের বিরুদ্ধে সরকারি চাল এতিম ও অসহায়দের মাঝে বিতরণ না করে গোপনে ব্যাপারীদের কাছে স্লিপ বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, তারা সরকারি চাল বিতরণের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। সেখানে কয়েকজনকে বারবার বস্তা নিয়ে এসে চাল ভর্তি করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
এলাকার কয়েকজন দুস্থ মানুষ কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তারা অত্যন্ত অসহায়। একটি স্লিপ পেলে তাদের অনেক উপকার হতো। কিন্তু তাদের গ্রামে কাউকে কোনো স্লিপ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
সাংবাদিকদের দাবি, চাল বিতরণের সময় বড়ধুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আছির উদ্দিন মোল্লা ও অন্য কোনো ইউপি সদস্যকে সেখানে দেখা যায়নি। চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের পর বড়ধুল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ কাউসার হোসেন এবং উপজেলা ট্যাগ অফিসার সহকারী প্রকৌশলী মোঃ শরিফুল ইসলাম দুপুরের মধ্যে সেখান থেকে চলে যান বলেও জানানো হয়েছে।
একই ব্যক্তি বারবার চাল নেওয়ার দৃশ্য সাংবাদিকদের নজরে এলে তারা দৌড়ে পালিয়ে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ফোন করে চাল বিতরণ বন্ধ করে দেন। বিতরণ বন্ধের ঘোষণা পাওয়ার পরও আয়নাল মেম্বারের নির্দেশে তার লোকজন সরকারি চাল বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ১২৭ বস্তা চাল অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাংবাদিকদের দাবি, এসব ঘটনার ভিডিওচিত্র প্রকাশ হওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।