বাংলাদেশে ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে জড়িত। পদ্মা, মেঘনা, চাঁদপুর কিংবা বরিশালের ইলিশের নাম শুনলেই ভোজনরসিকদের আগ্রহ বেড়ে যায়। তবে সম্প্রতি ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশ নিয়ে বাজারে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের গুজরাট থেকে আমদানি করা এক ধরনের মাছ বাংলাদেশে দেশি ইলিশের পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
তবে মাছটির প্রজাতি, আমদানি মূল্য ও বাজারজাতকরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন দাবি থাকায় বিষয়টি নিয়ে সরকারি সংস্থার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, বেনাপোল কাস্টমসের নথিতে জুলাই মাসে প্রায় ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি মাছ ৩৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যে আমদানি দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজির আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ১২০ টাকা।
আগস্ট মাসে প্রায় ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি মাছ প্রায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় আমদানি করা হয়। এতে প্রতি কেজির আমদানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২০৩ টাকা।
দুই মাসে মোট আমদানির পরিমাণ প্রায় ৩৫২ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে আমদানির পরিমাণ প্রায় ৫০০ টন বলে দাবি করা হয়েছে।
ফলে আমদানি মূল্য ও দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভারতের গুজরাট অঞ্চলে পাওয়া একটি মাছকে স্থানীয়ভাবে ‘পালভা’ বা ‘মোদেন’ নামে ডাকার তথ্য পাওয়া যায়। গুজরাটের ভারুচ, নর্মদা নদীর মোহনা ও খাম্বাত উপসাগর এলাকায় এ মাছ পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে আমদানি করা এই মাছকে স্থানীয় বাজারে কী নামে এবং কোন প্রজাতি হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকৃত মাছের গায়ে উৎপত্তিস্থল বা পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সেটিকে পদ্মা, মেঘনা, চাঁদপুর বা বরিশালের ইলিশ হিসেবে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন।
এতে সাধারণ ক্রেতারা প্রকৃত পরিচয় না জেনেই বেশি দাম দিয়ে মাছ কিনছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বাজার তদারকি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযান এবং পরীক্ষাগারের মাধ্যমে মাছের প্রজাতি শনাক্ত করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতে কাটা মাছের পেট থেকে ডিম আলাদা করার দৃশ্য দেখা গেছে। এসব ডিম উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাছের ডিম আলাদাভাবে বিক্রি করে বাকি মাছও বিভিন্ন মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বাজারজাত করা হচ্ছে। তবে ডিমের প্রকৃত বাজারদর ও এর উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
সাধারণ ক্রেতাদের প্রশ্ন, আমদানি করা মাছ যদি সত্যিই গুজরাটের হয়, তাহলে সেটিকে দেশি ইলিশের নামে বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা কেন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না?
আর যদি মাছটি ইলিশই হয়, তাহলে এর প্রজাতি ও উৎপত্তি সম্পর্কে সরকারি সংস্থাগুলোর স্পষ্ট তথ্য কেন থাকবে না?
ভোক্তাদের দাবি, বাজারে দেশি ও আমদানি করা ইলিশের পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হোক। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দামে মাছ বিক্রি এবং ভুল পরিচয়ে পণ্য বাজারজাতের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ইলিশের মতো একটি জাতীয়ভাবে পরিচিত খাদ্যপণ্য নিয়ে যেন কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা প্রতারণার সুযোগ না থাকে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর বাজার তদারকি এখন সময়ের দাবি।