ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। নদী ও সমুদ্র থেকে আহরিত এই প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো লালন-পালন বা খাদ্য খরচ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সরকার বদল কিংবা প্রশাসনিক নানা উদ্যোগের পরও এই ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। ‘আল্লাহর দান’খ্যাত এই মাছ মধ্যবিত্তের জন্য বিলাসিতা এবং নিম্নবিত্তের জন্য অধরা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বাজারের চিত্র ও দামের তারতম্য
বর্তমানে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও মিরপুরসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে ১ কেজি ওজনের তাজা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩,০০০ টাকা কেজি দরে। দেড় কেজি আকারের ইলিশের দাম কেজিতে ৩,২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এমনকি অতি ক্ষুদ্র (১৫০-২০০ গ্রাম) ইলিশের দামও ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, গত এক দশকে ইলিশের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
জেলে ও খুচরা বাজারের ব্যবধান
ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলে জেলেরা ১ কেজির একটি ইলিশ বিক্রি করছেন প্রায় ৮০০ টাকায়। কিন্তু সেই মাছ ঢাকায় আসার পর বিক্রি হচ্ছে ৩,০০০ টাকায়। জেলে থেকে খুচরা ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পাঁচটি মধ্যস্বত্বভোগী ধাপ (জেলে ➔ আড়ত ➔ পাইকার ➔ কমিশন এজেন্ট ➔ খুচরা বিক্রেতা) পার হতে হয়। হাতবদলের এই প্রক্রিয়া এবং যাতায়াত খরচের কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।
যেভাবে সক্রিয় ইলিশ সিন্ডিকেট
দাদন প্রথা: উপকূলের অধিকাংশ জেলে মহাজন বা আড়তদারদের কাছ থেকে অগ্রিম দাদনের টাকা নিয়ে সাগরে যান। ফলে আহরিত মাছ তারা নির্ধারিত কম দামে মহাজনের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
হিমাগার মজুত ও কৃত্রিম সংকট: পাইকাররা নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর প্রচুর ইলিশ কিনে কোল্ড স্টোরেজে মজুত করে রাখেন। পরবর্তীতে উৎসব বা পহেলা বৈশাখের মতো উচ্চ চাহিদার সময়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়।
নিয়ন্ত্রণহীন পাইকারি বাজার: ক্যাব (CAB)-এর মতে, আড়তদার, ট্রলার মালিক ও বড় ক্রেতাগোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে সমুদ্র থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দাম নির্ধারণে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অবিচার করা হচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও সুপারিশ
ভারতে পূজার মৌসুমে নির্ধারিত মূল্যে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এটি একটি ‘ধর্মীয় সৌজন্য’। অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (BTTC) মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো, জেলে সমবায়কে জোরদার করা এবং সরকারি সরাসরি বিপণন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করলেও এর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন এখনো সীমিত।
নদী-সমুদ্রের স্বতঃস্ফূর্ত ইলিশ সাধারণ মানুষের পাতে ফিরিয়ে আনতে বাজার তদারকি এবং দাদনকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।