বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন ইনিংস শুরু করেছে মোদী সরকার। তবে গত মাসে ঢাকা থেকে নয়াদিল্লিতে এসে বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের (ফেরত পাঠানোর) আর্জি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, শেখ হাসিনাকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠানো নিয়ে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (PMO) কোনো চিন্তাভাবনা নেই।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে ভারতে অবস্থানরত নিজের বর্তমান অবস্থা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং দেশে ফেরা নিয়ে ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন শেখ হাসিনা।
উল্লেখ্য, ছ’বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি প্রথমবার নিজ দেশে ফিরেছিলেন। তার ঠিক ৪৫ বছর পর আবারও ভারতে আশ্রিত থাকা শেখ হাসিনা নিজের প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে বলেন, “আমাকে এর আগে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমার দলকে ধ্বংস করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু আমাদের থামানো যায়নি। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে এবং দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর গর্ব নিয়েই ফিরব।”
নিষেধাজ্ঞা ও প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে:
আওয়ামী লীগের ওপর বর্তমান রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রত্যাবর্তন সম্ভব?—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করার পরেও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার সব রকমের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু উল্টো আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়েই জনগণের মাঝে ফিরে এসেছে। যারা এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী বা চূড়ান্ত মনে করছেন, আমি তাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে বলব।”
অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের কড়া সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “আমাদের কোটি কোটি সমর্থক এবং লাখো নেতা-কর্মী এখনো দেশেই রয়েছেন। এই সংকটেও ছাত্রলীগের ছেলেরাই অসহায় কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের নেতা-কর্মীরা ভেতরে ভেতরে সরব। আওয়ামী লীগ মানুষের আবেগে রয়েছে। ফলে আমাদের ফিরে আসা অনিবার্য, এটি শুধু কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে আমরা ফিরব; বর্তমানে নীরবে তার প্রস্তুতি চলছে।”
বিদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের ভূমিকা:
আওয়ামী লীগের বহু শীর্ষ নেতা-কর্মী এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা এই মুহূর্তে কলকাতার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “কেউ স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেননি। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। ছ’শোর বেশি নেতা-কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। দেড় লাখের বেশি নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারাবন্দিদের ন্যূনতম আইনি অধিকার পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই অবস্থায় যাঁরা দেশের বাইরে রয়েছেন, তাঁরা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতি তুলে ধরছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। দেশে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন তৈরি হলেই তাঁরা নিজ দেশে ফিরবেন। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও যাঁরা এই কঠিন সময়ে দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন, দল ভবিষ্যতে তাঁদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে।”
ভারত-তোষণ ও পররাষ্ট্রনীতির জবাব:
দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ‘ভারত-তোষণ’ বা দাসত্ব করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিরা সর্বদাই এই সস্তা অভিযোগ করেছে যে—আওয়ামী লীগ নাকি ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে বা দেশবিরোধী চুক্তি করেছে। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেও আজ পর্যন্ত একটিও তথাকথিত ‘দেশবিরোধী চুক্তি’ জনগণের সামনে হাজির করতে পারেনি। এতেই তাদের সব মিথ্যাচার প্রমাণিত হচ্ছে।”
নিজের শাসনামলের কূটনৈতিক অর্জন তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই আমরা ভারতের সাথে ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তি করেছিলাম। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের মানচিত্রে যোগ করেছিলাম। ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা গিয়েছে। এমনকি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনটি এই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের সময় বাংলাদেশের ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে কোনটা অন্য দেশের তাঁবেদারি বা তোষণ, তা বিএনপি স্পষ্ট করে বলুক? পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সর্বদা দেশের ও জনগণের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।”