বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন পরিমার্জিত পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। দেশের খ্যাতনামা আলেম ও ফকিহদের দীর্ঘ ১৬ বছরের পুরোনো পাঠ্যক্রম বাদ দিয়ে আকিদা (বিশ্বাস), ফিকহ (ইসলামি আইন) এবং আখলাক (চরিত্র গঠন) অধ্যায়গুলোতে বড় ধরণের রদবদল করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হানাফী মাযহাব ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ঐতিহ্যগত বিশ্বাসের পরিপন্থী এবং জামায়াতে ইসলামী ও সালাফী (আহলে হাদিস) মতবাদের আকিদা এই নতুন বইগুলোতে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিয়া নুরুল হক এবং কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ড. মো. হেদায়েত উল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ সম্পাদনা কমিটি এই অতিসংগোপন পরিমার্জন সম্পন্ন করেছেন বলে দেশের সুন্নি আলেম সমাজের একটি বড় অংশ দাবি করছেন।
একই সাথে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বইগুলো থেকে দেশবরেণ্য আলেম ও লেখক কবি মাওলানা রুহুল আমিন খান, ড. এ কে এম মাহবুবুর রহমান এবং উপাধ্যক্ষ মাওলানা আবুল কাশেম মো. ফজলুল হকের মতো লেখকদের নাম বাদ দিয়ে আড়ালে থাকা নতুন কিছু নাম প্রতিস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে আইনি প্রশ্নও উঠছে।
২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যবইয়ে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যে সকল প্রধান পরিবর্তন ও বিতর্কিত বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. তাসাউফ, তাযকিয়া ও পীর-মুরিদী অধ্যায় সম্পূর্ণ বাদ
পূর্ববর্তী বছরের (২০২৫) পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির আকাইদ ও ফিকহ বইয়ে ইসলামি আত্মশুদ্ধির মূল ভিত্তি ‘ইলমুত তাযকিয়া ওয়াত তাছাউফ’ এবং ‘কামেল মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা’ শিরোনামে বিস্তারিত অধ্যায় ছিল। নতুন বইয়ে এটিকে ‘শিরক ও বিদআত’ আখ্যা দিয়ে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির বই থেকে তরিকত-মারেফতের গুরুত্ব, অলির পরিচয়, অলির কারামত এবং মাজার জিয়ারতের মতো ১০টি মৌলিক বিষয় সংবলিত পুরো অধ্যায়টিই প্রত্যাহার করা হয়েছে।
২. অসিলা, রওজা জিয়ারত ও মেরাজের বর্ণনা পরিমার্জন
নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে পূর্বে নবী-রাসূল, সাহাবা ও আল্লাহর ওলীদের পবিত্র স্থানের অসিলা দিয়ে দোয়া করার বিষয়টি দলিলসহ বৈধ বলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের বইয়ে একে ‘অবৈধ’ ও ‘মাকরূহে তাহরিমি’ বলে ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।
মেরাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহ তাআলাকে সরাসরি দেখেছেন—এই সংক্রান্ত অংশটি নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের ২৩ পৃষ্ঠা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নবী করীম (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের ফজিলত এবং মদিনা মুনাওয়ারার পবিত্র স্থানসমূহের গুরুত্বসম্পর্কিত পরিচ্ছেদগুলো নতুন বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, নবীগণ রওজায় সশরীরে জিন্দা আছেন (হায়াতুন্নবী) সংক্রান্ত আবু দাউদ শরিফের হাদিসের রেফারেন্সও অষ্টম শ্রেণির বই থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
৩. তাওহীদের স্তর পরিবর্তন ও সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গ
সপ্তম শ্রেণির পূর্বের বইয়ে বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ হযরত শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)-এর কিতাবের আলোকে তাওহীদকে ৪টি স্তরে (তাওহীদ ফিযযাত, ফিসসিফাত, ফিল হুকুক ও ফিল ইবাদত) বিন্যস্ত করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের বইয়ে সালাফী আকিদা অনুসরণ করে ‘তাওহীদ ফিল হুকুক’ (আইন ও সার্বভৌমত্বের তাওহীদ) বাদ দিয়ে ৩টি স্তর (রুবুবিয়াহ, উলুহিয়াহ, ও যাত-সিফাত) দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, ‘তাওহীদ ফিল হুকুক’ বাদ দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আইনগত সার্বভৌমত্বের ভিত্তি দুর্বল করা হয়েছে।
৪. মাযহাবের বাধ্যবাধকতা শিথিল
সপ্তম শ্রেণির বইয়ে আগে লেখা ছিল—যিনি নিজে মুজতাহিদ (গবেষক) নন, তাঁর জন্য চার মাযহাবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা ‘ওয়াজিব’। ২০২৬ সালের সংশোধিত সংস্করণে ‘ওয়াজিব’ শব্দ বদলে লেখা হয়েছে ‘নিরাপদ ও উত্তম’। আলেমদের একাংশের মতে, এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাযহাব মানার বাধ্যবাধকতা উঠে যাবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।
৫. সালাত (নামাজ), তারাবি ও জানাজার নিয়মে বিতর্কিত সংযোজন
তারাবি নামাজ: আগে বইয়ে বলা ছিল ১০ সালামে ২০ রাকাত তারাবি পড়া সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐক্যমত)। নতুন বইয়ে সংযোজন করা হয়েছে, “২০ রাকাত আদায় করতেই হবে এমনটি নয়, কেউ চাইলে ৮ রাকাতও পড়তে পারে।” এছাড়া তারাবির নিয়ত, চার রাকাত পর পড়ার তাসবীহ ও মোনাজাত সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
জানাজা নামাজ: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী জানাজা নামাজে সানা পড়ার নিয়ম থাকলেও, নতুন বইয়ে সালাফী মতবাদ অনুযায়ী প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। জানাজা শেষে সমষ্টিগত দোয়ার পরিবর্তে শুধু ব্যক্তিগত দোয়ার কথা বলা হয়েছে।
নারী-পুরুষের নামাজ: পূর্বের বইয়ে পুরুষ ও নারীর নামাজে দাঁড়ানো ও সিজদার কিছু কাঠামোগত পার্থক্য (যেমন পায়ের ফাঁকা অংশ ও সিজদার ধরন) উল্লেখ থাকলেও, ২০২৬ সালের বইয়ে তা বাদ দিয়ে বলা হয়েছে—অধিকাংশ ইমামের মতে পুরুষ ও নারী একই নিয়মে সিজদা করবে।
অন্যান্য: জুমা নামাজের পূর্বের চার রাকাত সুন্নত (কবলাল জুমা), মাগরিবের পরের ছয় রাকাত আওয়াবিন নামাজ, এবং সালাতুত তাসবীহ সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো বিদআত হিসেবে বাদ বা পরিমার্জন করা হয়েছে। এছাড়া সব বই থেকে ওযু ও নামাজের আরবি নিয়ত তরজমাসহ বাদ দেওয়া হয়েছে।
৬. ঐতিহাসিক ভুল তথ্য সংযোজন ও শবে বরাত
পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর কারামতের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে—তিনি ‘রাজা দাহিরের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। অথচ ইতিহাস অনুযায়ী, শাহজালাল (রহ.) যুদ্ধ করেছিলেন সিলেটের ‘রাজা গৌর গোবিন্দের’ বিরুদ্ধে। রাজা দাহির ছিলেন সিন্ধুর শাসক, যার সাথে মুহাম্মদ বিন কাসিমের যুদ্ধ হয়েছিল। এই চরম ঐতিহাসিক ভুলটি নিয়ে শিক্ষাবিদদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এছাড়া পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই থেকে শবে বরাতের ফজিলত, রাতের ইবাদত এবং দিনের রোজার আমলগুলোকে বিদআত হিসেবে বাদ দেওয়া হয়েছে।