বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় ক্ষোভ, প্রায় ৩০ কিলোমিটার যানজটে দুর্ভোগে হাজারো মানুষ; অবশেষে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) প্রধান ফটকের সামনে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মিরসরাইয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত (২১)।
একটি কনটেইনারবাহী লরির ধাক্কায় যাত্রীবাহী ৮ নম্বর রুটের মিনিবাস উল্টে তাঁর ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আরও দুই ছাত্রী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পরে ছয় দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সড়ক ও রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়ে হাজারো যাত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীত পাশে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে লোকাল বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মাইশা ও তাঁর দুই সহপাঠী। এ সময় একটি কনটেইনারবাহী লরি পেছন দিক থেকে ৮ নম্বর রুটের একটি মিনিবাসকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে যায়।
এতে মাইশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আহত অন্য দুই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁদের চিকিৎসা শুরু হয়। একজনকে বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কে একটি যানবাহনকে পাশ কাটানোর সময় লরিটির নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। দুর্ঘটনার পর পুলিশ সংশ্লিষ্ট বাস ও লরি জব্দ করে।
নিহত মাইশা মুশফিরাত মিরসরাই উপজেলার ১২ নম্বর খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি সাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তার দম্পতির মেয়ে। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতেন মাইশা। ঘটনার দিনও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নিতে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন বলে জানা গেছে। পরে ক্লাস স্থগিত হওয়ায় বাড়ি ফেরার জন্য মহাসড়কের পাশে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু বাড়ি ফেরা আর হলো না তাঁর।
একটি দুর্ঘটনায় থেমে গেল তাঁর শিক্ষাজীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। মাইশার মৃত্যুর খবরে পরিবার, স্বজন, সহপাঠী ও এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং ক্যাম্পাসের সামনে নিরাপদ সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিতে সকাল ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। একই সঙ্গে রেললাইনে গাছের গুঁড়ি ফেলে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবি ছিল—
১. দুর্ঘটনার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বাদী হয়ে মামলা করতে হবে।
২. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাস ও লরির চালকদের গ্রেপ্তার করে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. কেডিএস ডিপোর সামনে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে।
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের উভয় পাশে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে।
৫. নিহত মাইশার পরিবারকে লরির মালিকের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৬. শিক্ষার্থীদের নিরাপদে মহাসড়ক পারাপার নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসের সামনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দীর্ঘদিন ধরে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত মহাসড়ক পারাপার করতে হয়। দ্রুতগতির ভারী যানবাহন চলাচল করলেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যানজট প্রায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যানজটের দৈর্ঘ্য আরও বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে থাকায় কর্মজীবী মানুষ, রোগী, শিক্ষার্থী, দূরপাল্লার যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ির চালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীরাও পড়েন বিপাকে।
মহাসড়ক অবরোধের পাশাপাশি রেললাইনেও অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। রেললাইনের ওপর গাছের গুঁড়ি ফেলে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সীতাকুণ্ড রেলস্টেশন মাস্টার নিজাম উদ্দিনের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের কারণে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতী সীতাকুণ্ড স্টেশনে এবং চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা মহানগর এক্সপ্রেস ফৌজদারহাট স্টেশনে আটকা পড়ে। এতে রেলপথে চলাচলকারী যাত্রীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ চলার পর বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ও রেলপথ থেকে অবরোধ তুলে নেন। এরপর ধীরে ধীরে যান চলাচল ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ঘটনাস্থলে যান সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পরে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
এ সময় পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং তাঁদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে লিখিতভাবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাসও দেন।
এ ছাড়া দুর্ঘটনায় জড়িত লরির চালককে গ্রেপ্তার এবং মহাসড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও আশ্বাস দেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব আশ্বাস পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোক প্রকাশ করেছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
এদিন বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মাইশার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন অংশ নেন।
জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোক আর ক্ষোভ। একজন শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আবারও সামনে এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন মহাসড়কে নিরাপত্তার অভাবের বিষয়টি।
কুমিরায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পারাপার হতে হয়। অথচ নিরাপদ পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ না থাকা, দ্রুতগতির ভারী যানবাহন চলাচল এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অভাব দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়।
মাইশার মৃত্যুর পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণসহ বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এখন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। আর কোনো শিক্ষার্থীকে যেন এভাবে প্রাণ দিতে না হয়।
একটি দুর্ঘটনা, একটি পরিবারের আজীবনের কান্না। মাইশার মৃত্যু যেন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য শেষ সতর্কবার্তা হয়ে থাকে।