একটি স্কুলছাত্রীর স্পষ্ট প্রতিবাদ—“বাজে অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলবেন না।” ছোট্ট এই বক্তব্যে ছিল নিজের ব্যক্তিগত মর্যাদা, সম্মান ও শারীরিক গোপনীয়তা রক্ষার দাবি। কিন্তু তার এই প্রতিবাদের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও অনলাইন হয়রানি।
ইউনিফর্ম পরা ওই কিশোরী ক্যামেরার দিকে আঙুল তুলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিল। সে জানিয়ে দিয়েছিল, তার ছবি কীভাবে তোলা হবে, সে বিষয়ে তারও মতামত রয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে নিজের সম্মান রক্ষার অধিকার তারও আছে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে না দেখে উল্টো কিশোরীকে নিয়ে বিদ্রূপে মেতে ওঠেন। কেউ তার গায়ের রং নিয়ে কটূক্তি করেন, কেউ ব্যক্তিগত সৌন্দর্য নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। আবার কেউ কেউ অশ্লীল ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যও করেন।
একজন কিশোরীর স্বাভাবিক প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে এমন আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক মানসিকতার চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবাদের জবাবে অপমান কেন?
কিশোরীটি কারও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেনি; বরং ছবি তোলার ক্ষেত্রে শালীনতা ও সম্মান বজায় রাখার কথা বলেছে। অথচ তার বক্তব্যের জবাবে কিছু মানুষ গায়ের রং, সৌন্দর্য ও শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
এখানেই সামনে আসে সমাজের একটি গভীর সমস্যা। এখনো অনেকের কাছে নারীর সৌন্দর্যকে গায়ের রং ও বাহ্যিক অবয়ব দিয়ে বিচার করার প্রবণতা রয়েছে। ফর্সা কিংবা কালো, সুন্দর কিংবা সাধারণ—এসব পরিচয়ের বাইরে একজন নারীর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, ইচ্ছা ও সম্মানের মূল্য যে অনেক বেশি, তা অনেকেই ভুলে যান।
কমেন্ট বক্সে নারীর প্রতি অবমাননার ভাষা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু মন্তব্যে স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের খাবারের সঙ্গে তুলনা করে অশালীন ও অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এসব মন্তব্যকে নিছক রসিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের নিয়ে এমন যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য তাদের মানসিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার জন্য উদ্বেগজনক।
যে মেয়েটি নিজের ছবি তোলার ধরন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, তার সেই আপত্তিকে সম্মান করার পরিবর্তে তাকে অপমান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বর্ণবাদী মানসিকতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
সমাজে গায়ের রং নিয়ে বৈষম্য নতুন নয়। বিজ্ঞাপনে ফর্সা হওয়ার প্রচারণা, বিয়ের ক্ষেত্রে ‘ফর্সা পাত্রী’ খোঁজার প্রবণতা কিংবা পরিবারে মেয়ের গায়ের রং নিয়ে দুশ্চিন্তা—এসব আচরণ দীর্ঘদিন ধরে বর্ণবাদী মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই মানসিকতার প্রকাশ ঘটছে। অথচ গায়ের রং কখনো একজন মানুষের যোগ্যতা, সৌন্দর্য কিংবা মর্যাদার মাপকাঠি হতে পারে না।
সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা জরুরি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য, যৌন হয়রানি, অপমান ও ব্যক্তিগত মর্যাদাহানি গুরুতর বিষয়। এসব আচরণের শিকার হলে সংশ্লিষ্ট মন্তব্য ও পোস্টের প্রমাণ সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট এবং আইনগত সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরীদের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিভাবক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
ওই স্কুলছাত্রীর বক্তব্য আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ছবি তোলার ক্ষেত্রে সম্মতি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মানুষের মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কোনো মেয়ের গায়ের রং, পোশাক কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে কটূক্তি করার অধিকার কারও নেই। একজন কিশোরী নিজের সম্মানের কথা বলেছে, আর সেই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যারা তাকে অপমান করেছে, তাদের মানসিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
বাজে অ্যাঙ্গেল শুধু ক্যামেরায় তৈরি হয় না, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও তৈরি হয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এখন সময়ের দাবি।