নদীতে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালান বাবা। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই বড় হয়েছেন মেয়ে লিকা পোদ্দার। ছোটবেলা থেকে ব্যাডমিন্টন খেলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছরের নিরলস সাধনা। অবশেষে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে শিরোপা জিতে দেশের সেরা হয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এই শিক্ষার্থী।
জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় শিরোপা জয়ের পর আনন্দের মুহূর্তটি সবার আগে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন মোংলায় থাকা মায়ের সঙ্গে। ভিডিও কলে মাকে সুসংবাদ দেওয়ার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি লিকা। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি। তাঁর এই অশ্রুতে মিশে ছিল বছরের পর বছর ধরে বয়ে চলা সংগ্রাম, অপেক্ষা আর স্বপ্নপূরণের তৃপ্তি।
নারী এককের ফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উর্মি আক্তারকে হারিয়ে শিরোপা জেতেন ২৪ বছর বয়সী লিকা। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে খেলা এই শাটলার টানটান উত্তেজনার ম্যাচে উর্মিকে পরাজিত করেন ২২-২০, ১১-২১ ও ২১-১৮ পয়েন্টে। পাঁচ বছরের সিনিয়র ক্যারিয়ারে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি।
তবে লিকার এই সাফল্য কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি সংগ্রামী পরিবারের দীর্ঘ লড়াই। মোংলায় বেড়ে ওঠা লিকার বাবা পেশায় মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে চলে তাঁদের চার সদস্যের সংসার। এমন আর্থিক বাস্তবতায় খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তবু সীমাবদ্ধতাকে বাধা হতে দেননি তিনি।
২০১৯ সালে মোংলায় ব্যাডমিন্টনের সঙ্গে লিকার পরিচয়। প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুসের অধীনে একটি পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তৈরি কোর্টে তিন থেকে চার বছর অনুশীলন করেন তিনি। পরে তাঁকে দিনাজপুরে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয়। সেখানকার প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এলোরা শাটলিন অ্যাকাডেমি, কাওসাকি ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ এবং কোচের সহযোগিতাও এগিয়ে যাওয়ার পথে সহায়ক হয়েছে।
জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি জানিয়ে লিকা বলেন, ‘আমার এই যাত্রা অনেক দিনের। গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে খেলছি। শুরু থেকেই আমার একটা লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। অবশেষে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের ও গর্বের।’
এবারের প্রতিযোগিতায় ছেলেদের বিভাগে ৫১২ জন এবং মেয়েদের বিভাগে ৮৩ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। নকআউট পদ্ধতিতে একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছানো এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা অর্জনকে নিজের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন লিকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ও খেলাধুলা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া লিকার জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্লাস, পরীক্ষা এবং নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয় তাঁকে। তাঁর মতে, গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের খেলাধুলায় এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক সময় খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারকেও এলাকার মানুষের নানা মন্তব্য শুনতে হয়। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর পরিবার সব সময় পাশে থেকেছে। মেয়েকে দেশের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখার স্বপ্ন ছিল মা-বাবারও। তাঁদের সমর্থনই তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
নিজের সাফল্যের পেছনে প্রথম কোচের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন লিকা। তিনি বলেন, ‘মিলন সর্দার জুস সব সময় চেষ্টা করেছেন, যাতে আমি ভালো করতে পারি এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাই।’ পরিবারের সমর্থন, কোচের দিকনির্দেশনা ও নিজের পরিশ্রমের সমন্বয়েই দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াসুবিধা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিকা বলেন, যবিপ্রবিতে জাতীয় পর্যায়ে খেলা ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে ভালো অবস্থান ধরে রাখতে নিয়মিত অনুশীলন ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কোচের সংকট অনুভব করেন তিনি। কাফি স্যারের বাইরে আরও দক্ষ কোচের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন এই খেলোয়াড়।
লিকার মতে, জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ সামলাতে হয়। ফলে অনেক সময় দুটি দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। খেলোয়াড়দের বাস্তবতা বিবেচনায় উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা থাকলে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া আরও সহজ হবে।
নতুন খেলোয়াড়দের উদ্দেশে লিকার পরামর্শ, সাফল্যের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা, নিয়মিত অনুশীলন করা, কোচের নির্দেশনা মেনে চলা এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকা জরুরি। এক দিনে ভালো ফল পাওয়া যায় না; এর জন্য সময়, ধৈর্য ও পরিশ্রম প্রয়োজন। তাঁর মতে, খেলাধুলার মাধ্যমে পরিচিতি ও সম্মান অর্জনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তাই যারা খেলাধুলায় আসতে চান, তাঁদের আন্তরিকতা নিয়ে শুরু করে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
লিকার এই সাফল্যে গর্বিত যবিপ্রবি প্রশাসনও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা দপ্তরের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. অভিনু কিবরিয়া বলেন, ‘লিকা পোদ্দারের এই সাফল্যে আমরা অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা চালিয়ে এসে তার চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমরা আশাবাদী, ভবিষ্যতেও সে আরও সাফল্য অর্জন করবে। তার জন্য আমাদের আন্তরিক শুভকামনা রইল।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কে তিনি বলেন, সম্প্রতি ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় শিক্ষার্থীরা ভালো পারফরম্যান্স করছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক ও কোচদের প্রচেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠার ফলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়েরা ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারছেন।
তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও স্বীকার করেন ড. অভিনু কিবরিয়া। তিনি বলেন, সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিক্ষার্থীদের ভালো করার জন্য তাঁদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। ভবিষ্যতে খেলাধুলায় আরও ভালো ফল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাফল্য বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় শিরোপা জয়ের পর লিকার লক্ষ্য এখন সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে গৌরব বয়ে আনা। নদীতে মাছ ধরে সংসার চালানো বাবার মেয়ের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি।