ভারত সরকারের বহুল আলোচিত ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন—সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গতকাল বুধবার (২০ মে) নবান্নে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে তিনি এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর যেসব ব্যক্তি বৈধ নথিপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁরা সবাই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, “রাজ্য পুলিশ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করবে এবং তাঁদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। পরবর্তীতে বিএসএফ আইনি প্রক্রিয়া মেনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির (পূর্বতন বিডিআর) কাছে তাঁদের হস্তান্তর বা ডিপোর্ট করবে।”
আগের সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা:
বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ভারত সরকার ২০২৫ সালের ১৪ মে একটি বিশেষ নির্দেশিকা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে পাঠিয়েছিল। যেখানে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ভারত সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি প্রতাপ সিং রাওয়াত এই সংক্রান্ত আইনি নথি পাঠালেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন (তৃণমূল) সরকার ভোটব্যাংকের রাজনীতির কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে আজ থেকে আমরা এই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করলাম।”
কারা পাবেন নাগরিকত্ব, কারা হবেন ‘অবৈধ’?
নতুন পরিমার্জিত আইন অনুযায়ী, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া নির্দিষ্ট সাতটি অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সিএএ-র আওতায় নাগরিকত্ব পাবেন। ২০২৪ সালে আইনটির কিছু পরিমার্জন করার কারণে, পূর্বের ২০১৪ সালের পরিবর্তে এখন ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে প্রবেশ করা অমুসলিম refugees বা শরণার্থীরা এই আইনের সুফল পাবেন এবং পুলিশ তাঁদের কোথাও হেনস্তা করতে পারবে না।
তবে এই আইনের আওতা থেকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বা পরে আসা এই দেশগুলোর মুসলিম নাগরিকরা সম্পূর্ণ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে গণ্য হবেন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে তাঁর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, “যাঁরা সিএএ-র আওতায় নেই, তাঁরা সম্পূর্ণ অবৈধ। তাঁদের রাজ্য পুলিশ চিহ্নিত করে আটক করবে এবং বিএসএফের মাধ্যমে ডিপোর্ট করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ (চিহ্নিতকরণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়া এবং দেশ থেকে ফেরত পাঠানো) নীতি আমরা বাস্তবায়ন করছি।”

বিএসএফকে ২৭ কিলোমিটার জমি দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার:
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মোট ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার সীমান্তই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, অন্য চারটি সীমান্ত রাজ্য (আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মেঘালয়) বিএসএফের চাহিদামতো পূর্ণাঙ্গ জমি আগেই হস্তান্তর করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারে বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়েছে, বাকি প্রায় ৬০০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যায়নি। এর জন্য তিনি সাবেক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে সরাসরি দায়ী করেন।
সীমান্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করার প্রত্যয় জানিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্রুততার সঙ্গে এই জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে চলেছি। আজকে এর সূচনালগ্নে আমরা অবশিস্ট সীমান্তের ২৭ কিলোমিটার এলাকাকে সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি জমি—যা আমরা কিনেছি এবং যার সম্পূর্ণ অর্থ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আমাদের দিচ্ছে, তা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক সূচনা করলাম।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে যেখানে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া প্রয়োজন, তার জন্য যেটুকু জমি দরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার অতি দ্রুততার সঙ্গে বিএসএফকে তা সরবরাহ করবে।