খুলনায় বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির যখন মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন, তখনই জেলার তেরখাদায় প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস (৩২)। শনিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের পারহাজী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একদিকে পুলিশ-জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার বার্তা, অন্যদিকে প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, খুলনায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রামিম বিশ্বাস ভ্যানে করে কোলাবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। সেনেরবাজার-মধুপুর সড়কে খান ব্রিকসের সামনে আইনাল মোল্লার বাড়ির কাছে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুই থেকে তিনজন দুর্বৃত্ত পেছন থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়।
গুলিতে তাঁর পিঠের ডান পাশে বা পাঁজরের অংশে আঘাত লাগে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গুলির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও হামলার কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
শনিবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে কমিউনিটি পুলিশিং-সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একই দিনে তেরখাদায় গুলির ঘটনা জননিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, অপরাধ দমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি জোরদার করা কতটা সম্ভব হচ্ছে?
প্রতিবেদনে উল্লেখিত পুলিশি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত নয় মাসে খুলনা জেলায় ৬৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে নগরীতে ৩৫টি। এ ছাড়া গত ২২ অক্টোবর পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও সামনে এসেছে।
রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদাসহ কয়েকটি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যানের সময়সীমা, শ্রেণিবিন্যাস ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রকাশের আগে সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুনরায় যাচাই করা জরুরি।
তেরখাদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহম্মেদ আলী বিশ্বাস এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী শুভ্রর বক্তব্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা বা কোনো অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং মাদকসংক্রান্ত বিরোধের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এমন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যও নেওয়া জরুরি।
তেরখাদায় গুলির ঘটনা সামনে রেখে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে:
১. প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অগ্রগতি কতটুকু?
২. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধ প্রতিরোধে কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
৩. ধারাবাহিক সহিংসতার আশঙ্কা কমাতে পুলিশের টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা কীভাবে বাড়ানো হবে?
মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশিংয়ের লক্ষ্য বাস্তবায়নে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু আশ্বাস নয়, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
খুলনাবাসীর প্রত্যাশা, তেরখাদায় গুলির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক, জড়িত ব্যক্তিরা আইনের আওতায় আসুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
রবিউল ইসলাম
খুলনা প্রতিনিধি, কালান্তর নিউজ
কার্যকরী সদস্য, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, খুলনা