সাত বছরের একটি শিশু। মাদ্রাসায় যেতে চায় না, ভয়ে গুটিয়ে থাকে। মা বারবার জানতে চাইলে ফিসফিস করে বলে, শিক্ষক তাকে নিষেধ করেছেন, বিষয়টি কাউকে জানালে মারধর করা হবে।
শিশুটির পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ভীতিকর অভিজ্ঞতার অভিযোগ সামনে আসার পরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। আর সেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এক তরুণ, শাহজালাল রুমি। অভিযুক্ত শিক্ষককে থাপ্পড় মারার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
কেউ তার পদক্ষেপকে শিশুর প্রতি নির্যাতনের অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কে এই শাহজালাল রুমি, আর টঙ্গীর ঘটনায় কী ঘটেছিল?
শাহজালাল রুমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত একজন তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আলোচনায় এসেছেন। তার সঙ্গে ‘RUMi RUNs’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল এবং ‘Rumi Textile’ নামের একটি উদ্যোগের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে তার অবস্থান ও বক্তব্য নিয়েও অনলাইনে আলোচনা রয়েছে। তবে তার পেশাগত পরিচয়, অনুসারীর সংখ্যা এবং ব্যক্তিগত পরিচিতি সম্পর্কে প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্রে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার করিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে। প্রকাশিত সংবাদ ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রিন্সিপাল মুসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে।
পরিবারের দাবি, ঘটনার পর শিশুটি ভয়ে মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। প্রথমে সে বিষয়টি প্রকাশ করতে সাহস পায়নি। পরে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটি তার অভিজ্ঞতার কথা জানায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
গত ২১ অক্টোবর দুপুরে শিশুটির পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসায় যান। সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষককে প্রশ্ন করা হলে একপর্যায়ে তিনি শিশুটিকে অশালীনভাবে স্পর্শ করার কথা স্বীকার করেন বলে পরিবারের দাবি। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে শাহজালাল রুমি তাকে থাপ্পড় মারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সেই মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে স্থানীয় লোকজন মাদ্রাসায় জড়ো হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পুলিশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা এবং শিশুটিকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। তাৎক্ষণিক ক্ষোভ থেকে কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করা আইনগত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাই ঘটনাটিকে শুধু একজনের সাহসিকতা কিংবা একটি থাপ্পড়ের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে শিশুর সুরক্ষার মূল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
শাহজালাল রুমিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা যতই বাড়ুক, এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সাত বছরের শিশুটির নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ রয়েছে কি না এবং অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষ কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একটি থাপ্পড়ের ভিডিও হয়তো মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তা হলো: শিশুরা যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিতে যায়, সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে পালন করবে?
কালান্তর নিউজ | সত্যের সন্ধানে, মানুষের পাশে।