নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে কাভরেপালাঞ্চোক জেলার ছোট্ট গ্রাম হোকসে। গত দুই দশকে কিডনি বিক্রির ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে আলোচনায় এসেছে গ্রামটি। এ কারণে অনেক প্রতিবেদনে হোকসেকে ‘কিডনি ভিলেজ’ বা ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গ্রামের বহু বাসিন্দা দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকটের কারণে একটি কিডনি বিক্রি করেছেন। কোথাও কোথাও শতাধিক মানুষের কিডনি বিক্রির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
হোকসের বাসিন্দাদের কিডনি বিক্রির পেছনে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সীমিত কর্মসংস্থান এবং নিম্ন আয়ের কারণে অনেক পরিবার দ্রুত অর্থ পাওয়ার আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত ছিল দালালদের প্রতারণা। অভিযোগ রয়েছে, দালালরা স্থানীয় বাসিন্দাদের বোঝাত যে একটি কিডনি ছাড়াও মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে। এমনকি অস্ত্রোপচারের পর কিডনি আবার গজিয়ে উঠবে—এমন মিথ্যা কথাও কাউকে কাউকে বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত ও নেপালের মধ্যে দীর্ঘদিনের উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র মানুষকে ভারতে নিয়ে যেত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের সময় জাল কাগজপত্র তৈরি করে দাতা ও গ্রহীতাকে আত্মীয় হিসেবে দেখানোর ঘটনাও উঠে এসেছে।
বিনিময়ে ভুক্তভোগীরা তুলনামূলকভাবে অল্প অর্থ পেলেও দালাল ও সংশ্লিষ্ট চক্র বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিডনি বিক্রির ঘটনা একপর্যায়ে সামাজিকভাবেও ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কেউ কিডনি বিক্রির অর্থ দিয়ে জমি, বাড়ি, টেলিভিশন কিংবা মোটরসাইকেল কিনলে অন্যরাও একই পথে যাওয়ার কথা ভাবতেন।
এমনকি কিডনি বিক্রি করা ব্যক্তিদের কেউ কেউ পরে দালালদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্য বাসিন্দাদেরও একই চক্রে নিয়ে আসতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প হোকসের এই পরিবারগুলোর দুর্দশা আরও বাড়িয়ে দেয়। কিডনি বিক্রির অর্থে নির্মিত কিছু ঘরবাড়িও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে অনেক পরিবার একদিকে হারিয়েছে ঘরবাড়ি, অন্যদিকে হারিয়েছে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
কিডনি বিক্রির পর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা, কঠিন কাজ করতে না পারা এবং মানসিক চাপের মুখে পড়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হোকসের ঘটনা শুধু দারিদ্র্যের একটি উদাহরণ নয়। এর সঙ্গে মানব পাচার, অঙ্গ পাচার, প্রতারণা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে শোষণের মতো গুরুতর বিষয় জড়িত। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে এমন ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে সচেতনতা, কর্মসংস্থান এবং অঙ্গ পাচারবিরোধী আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।