দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের প্রতিদিনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে সাতজনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে এবং প্রতি মাসেই মৃত্যুর মিছিল আগের মাসের চেয়ে দীর্ঘতর হচ্ছে।
সর্বশেষ গতকাল শনিবার (২৩ মে) সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে আরও ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ১ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত মাত্র ৭০ দিনে দেশে হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে।
পরিসংখ্যানের চোখে মৃত্যুর ভয়াবহতা:
চলতি বছরের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর ২ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪০ জন। তবে এপ্রিল মাসজুড়ে পরিস্থিতি অবনতি হতে থাকে এবং ৩ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে মারা যায় ২৪০ জন। মে মাসের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেয়; চলতি মাসের প্রথম ২২ দিনেই (১ থেকে ২২ মে) প্রাণ হারিয়েছে ২৩২ জন শিশু। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ৫০৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে এবং বর্তমানে ৪ হাজার ৩৭৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
টিকা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও কমছে না মৃত্যু:
সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। গত ২২ মে পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩১count ১৪৯ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ৫ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশু টিকা পাওয়ায় সংখ্যার দিক থেকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, আক্রান্তদের প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৪ জনের ব্যবস্থাপনাই ৫ বছরের নিচে।
এদিকে, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮-১০ শতাংশের ডায়রিয়া, ২০ শতাংশের কান পাকা এবং ৫ শতাংশের নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে। এই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই মূলত বেশি মারা যাচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা:
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বিভিন্ন হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া বেশ কয়েকটি ভেন্টিলেটর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা জানিয়েছে, দেশের সরকারি হাসপাতালের ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যার একটি বড় অংশ হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে চিকিৎসকেরা স্বীকার করেছেন, সব আইসিইউ শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়। এছাড়া শিশুদের সহজে অক্সিজেন দেওয়ার জন্য বিজ্ঞানী আহমেদ জুবায়ের চিশতির উদ্ভাবিত ‘বাবল-সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে পৃথক ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করছেন, শুধুমাত্র ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বাড়ানোই সমাধান নয়। আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, “মৃত্যু কমাতে হলে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে হবে। শুধু ভেন্টিলেটর শিশুদের বাঁচাতে পারবে না।”
জরুরি ৩টি পরামর্শ:
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন ৩টি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন:
১. বিদ্যমান আইসিইউগুলোকে দ্রুত শিশুদের ব্যবহার উপযোগী (Paediatric ICU) করতে হবে এবং প্রয়োজনে বেসরকারি খাতের আইসিইউগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
২. হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ অনেক শিশুর আইসিইউর প্রয়োজন নেই, শুধু অক্সিজেন পেলেই তারা সুস্থ হতে পারে।
৩. সবচেয়ে জরুরি হলো ‘কমিউনিটি আইসোলেশন’। আক্রান্ত শিশুকে বাড়িতে না রেখে উপজেলা বা শহরে পৃথক কোনো স্থানে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তা দিতে হবে।