
দেশব্যাপী খেলার মাঠ ও পার্ক পুনরুদ্ধার, আধুনিকায়ন এবং মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার (৮ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি’র কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে উত্থাপিত এক জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
মাঠ ও পার্কের বর্তমান চিত্র ও উদ্বেগ:
এর আগে নোটিশ উত্থাপনকালে সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি দেশের খেলার মাঠ ও পার্কগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের খেলার মাঠ ও পার্ক একসময় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা এবং বয়স্কদের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমানে এসব স্থানের অনেকগুলোই মাদকসেবী, বখাটে, অবৈধ দখলদার ও হকারদের দখলে চলে গেছে। কোথাও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, কাঁচাবাজার, আবার কোথাও ক্লাব ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে মাঠের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।”
বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, রাজধানীতে গত কয়েক বছরে ১২৬টি মাঠ হারিয়ে গেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ রয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকরভাবে উন্মুক্ত আছে মাত্র ৪২টি মাঠ—যা মোট মাঠের মাত্র ১৮ শতাংশ। খেলার মাঠকে নগরের ‘ফুসফুস’ আখ্যা দিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মোবাইল নির্ভর জীবন থেকে বের করে আনতে মাঠ ও পার্ক রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
মন্ত্রীর জবাব ও সরকারের পদক্ষেপ:
সংসদ সদস্যের বক্তব্যের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উত্থাপিত তথ্যগুলোকে বাস্তবসম্মত বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “বিগত সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে দেশের অনেক মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান দখল হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এসব স্থান পুনরুদ্ধার করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার কাজ শুরু করেছে।”
মন্ত্রী সংসদে সরকারের চলমান কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেন:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন: ডিএসসিসির আওতাধীন ২৫৬টি পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চলছে। গুলিস্তানের শহীদ মতিউর রহমান পার্ককে হকার ও অপরাধমুক্ত করে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মতিঝিল পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, রসুলবাগ মাঠ, খিলগাঁও-বাসাবো মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, হাজারীবাগ পার্ক ও আমলীগোলা খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন: ডিএনসিসির আওতায় ইতিমধ্যে ৩৮টি পার্ক ও মাঠ আধুনিকায়ন করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চলছে।
অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন: চট্টগ্রাম ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের আওতায় পার্ক নির্মাণ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ডাক:
পরবর্তীতে মাঠ ও পার্কে মাদকসেবীদের উপস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মাদককে একটি বড় সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এজন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা।”
যুবসমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের মাঠ ও পার্কগুলোকে দ্রুত দখলমুক্ত ও নিরাপদ শিশু-কিশোরবান্ধব পরিবেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।