কালান্তর নিউজ ডেস্ক
১৯ জুলাই ২০২৬, ৮:৩৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শুধুই কি জেলা প্রশাসকরা দায়ী! বিতর্কিত নির্বাচনের দায়ে ঢালাও বাধ্যতামূলক অবসরে বিপাকে প্রশাসন

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব দায় যেন এসে পড়েছে মাঠ প্রশাসনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ওপর। তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততায় অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনগুলোর জেরে এখন ঢালাও শাস্তির মুখে পড়ছেন ডিসিরা।

ইতিমধ্যেই চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া অর্ধশত ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদেরও চলতি সপ্তাহে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ (সামারি) প্রস্তুত করেছে বলে সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ওএসডি হয়ে কর্মহীন থাকা এই চৌকস কর্মকর্তাদের এমন পরিণতিকে প্রশাসনের জন্য এক ‘বুমেরাং’ সিদ্ধান্ত ও ‘কালো নজির’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ডিসিদের অবসর চান না বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারাও

প্রশাসনে বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও এই ঢালাও বাধ্যতামূলক অবসরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, অতীতে প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে চর্চা ছিল, তারা তার পুনরাবৃত্তি চান না। দক্ষ কর্মকর্তাদের এভাবে বিদায় দিলে দেশেরই ক্ষতি হবে এবং ভবিষ্যতে পটপরিবর্তন হলে আবারও এই বাধ্যতামূলক অবসরের নোংরা খেলা শুরু হবে। কর্মকর্তাদের কোনো ভুলভ্রান্তি থাকলে তা শুধরে নিয়ে তাদের কাজে লাগানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।

ভোট জালিয়াতি খুঁজতে স্বাধীন কমিশনের প্রস্তাব

কারা সত্যিকার অর্থে ভোট জালিয়াতি ও অতি-উৎসাহী হয়ে দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেছিলেন, তা চিহ্নিত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। কিন্তু সেই কমিশন গঠন বা তদন্ত প্রতিবেদন আসার আগেই ঢালাওভাবে ২২ জন ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং আরও ২৩ জনকে ওএসডি করে রাখা হয়েছে। শাস্তির মুখে থাকা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একটি জেলার নির্বাচনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ইসি সচিব থেকে শুরু করে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রিসাইডিং অফিসাররা সরাসরি যুক্ত থাকেন। অথচ শাস্তির পরিধি কেবল ডিসি ও এসপিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে, যা চরম বৈষম্যমূলক।

‘ডিসিরা কেবল পোস্ট বক্সের মতো কাজ করেন’

প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, “নির্বাচনে ডিসিদের ক্ষমতা থাকে খুবই সীমিত। তারা মূলত একটি ‘পোস্ট বক্স’ হিসেবে কাজ করেন। প্রিসাইডিং অফিসাররা যে ফল পাঠান, তারা কেবল তা যোগ করে ইসিতে পাঠান। অথচ শাস্তির ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে তাদের ওএসডি বা অবসরে পাঠানো রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি। যারা অপরাধ করেছে তাদের সুনির্দিষ্ট শাস্তি হোক, কিন্তু প্রশাসনে আতঙ্ক তৈরি করা ঠিক হবে না।”

একই সুর শোনা গেছে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের কণ্ঠেও। ২০১৮ সালে একটি বড় জেলায় দায়িত্ব পালন করা এক ডিসি জানান, “ব্যালট পেপার পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর পাহারায় থাকে। প্রিসাইডিং অফিসাররা কেন্দ্রের ফল পাঠানোর পর আমরা তা কেবল যোগ করি। আমাদের কি ক্ষমতা ছিল যে ফল পরিবর্তন করব? অথচ এখন সব দায় আমাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।”

ন্যায়বিচার চান ওএসডি থাকা কর্মকর্তারা

তদন্ত ছাড়াই ঢালাও শাস্তির প্রক্রিয়া বন্ধ করে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা। ২০১৮ সালে পার্বত্য একটি জেলায় দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক ডিসি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার জেলায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হয়েছিল, দিনের ভোট দিনেই হয়েছে এবং কোনো প্রার্থীর অভিযোগ ছিল না। অথচ তদন্ত ছাড়াই আমাকে ওএসডি করে রাখা হয়েছে। সারাজীবন রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে এখন অপরাধীর মতো জীবন পার করছি। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, “নির্বাচনগুলো হয়েছিল তৎকালীন রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছায়। সেখানে ডিসিদের পক্ষে সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ কতটা ছিল? যোগ্য ও ভালো কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা এভাবে ঢালাও অবসরের মাধ্যমে নষ্ট করলে ভবিষ্যতের সরকার ও প্রশাসন চরম বিপদে পড়বে। বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, তারাও একদিন একই ফাঁদে পড়তে পারেন।”

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

Spotify Review 2026

১

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

২

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৩

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৪

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৫

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৬

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৭

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

৮

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

৯

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১০

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১১

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১২

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৩

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৪

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৫

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৬

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৭

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

১৮

নাগেশ্বরীতে জুয়ার আসর থেকে যুবশক্তির নেতা আটক, ঘণ্টাখানেক পর মুচলেকায় মুক্তি

১৯

ফুলবাড়ীতে ডিবির অভিযানে ১০৩ পিস ইয়াবাসহ একজন গ্রেপ্তার

২০