ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস আজ
‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে জাত-পাত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবতার দর্শন তুলে ধরেছিলেন বাউল সাধক ফকির লালন শাহ। তাঁর গান ও দর্শন আজও বাঙালির চিন্তা, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনায় গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।
আজ ১৭ অক্টোবর তাঁর ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে সাধুসঙ্গ ও স্মরণানুষ্ঠান ঘিরে ভক্ত-অনুরাগীদের সমাগম ঘটেছে।
লালন শাহ ছিলেন বাংলা লোকসংগীত ও বাউল দর্শনের অন্যতম প্রভাবশালী সাধক। তাঁর গানে মানুষের পরিচয়, আত্মঅনুসন্ধান, দেহতত্ত্ব, গুরু-শিষ্য সম্পর্ক এবং জাত-ধর্মের বিভেদ অতিক্রম করার আহ্বান উঠে এসেছে।
জীবদ্দশায় নিজের জন্মপরিচয় সম্পর্কে নীরব থাকায় তাঁর জন্মস্থান, জন্মসাল ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
লালন শাহের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত। প্রচলিত বিভিন্ন বিবরণে তাঁর জন্মস্থান হিসেবে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের নাম পাওয়া যায়। তবে তাঁর মৃত্যুর তারিখ হিসেবে ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর বহুল প্রচলিত।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, তীর্থযাত্রার পথে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে তিনি সঙ্গীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরে ছেঁউড়িয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সংস্পর্শে এসে ফকিরি সাধনায় যুক্ত হন। এই কাহিনির বিভিন্ন বিবরণ প্রচলিত থাকলেও সব তথ্যের পক্ষে সমানভাবে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল নেই।
লালনের দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের পরিচয়কে জাত-ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রাখা। তাঁর বিখ্যাত গান ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ আজও সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক বিভেদের বিরুদ্ধে মানবিক বার্তা বহন করে।
তাঁর আরও জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ এবং ‘জাত গেল জাত গেল বলে’। এসব গানে মানুষের অন্তর্জগৎ, আত্মপরিচয় ও জীবনের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা লালনগীতি। তবে একসময় মূলধারার সাংস্কৃতিক পরিসরে বাউলসংগীত যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।
লালনের গানে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, জাতপাতের বিভেদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তাঁর দর্শনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তান আমলে রেডিওতে লালনগীতি প্রচারে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল বলে বিভিন্ন লেখায় দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সরকারি নথি বা সমসাময়িক প্রামাণ্য সূত্র ছাড়া নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
লালনের গানকে বৃহত্তর বাঙালি সমাজে পরিচিত করে তুলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লালনের গান সংগ্রহ ও সেগুলোর ভাবধারা শিক্ষিত সমাজের সামনে তুলে ধরতে ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনগীতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর পরিবেশনা শহুরে শ্রোতাদের মধ্যেও লালনের গানকে নতুন করে পরিচিত করে তোলে।
লালন শাহের গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব প্রচলিত রয়েছে। তাঁর গান দীর্ঘদিন ধরে শিষ্যদের স্মৃতি ও মৌখিক পরিবেশনার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর দর্শন শুধু সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের আত্মপরিচয়, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন আখড়াবাড়ি তাঁর স্মৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিবছর তাঁর তিরোধান দিবস উপলক্ষে সেখানে সাধুসঙ্গ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। দেশ-বিদেশের বাউল, ফকির ও অনুরাগীরা এই আয়োজনে অংশ নেন।
জাত-ধর্মের বিভেদ, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বৈষম্যের সময়ে লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে আলোচনায় আসে। তাঁর গান মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল বাহ্যিক পরিচয়ে নয়, বরং তার মানবিকতা ও কর্মে।
প্রায় দেড় শতাব্দী পেরিয়েও লালনের গান মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়, নিজের পরিচয়কে ঘিরে বিভেদ তৈরি করে মানুষ কতটা এগোতে পারে? সেই প্রশ্নের মধ্যেই আজও বেঁচে আছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ।