চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় সাংবাদিকের গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি, পুলিশের ভূমিকা এবং কারখানার পানির মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
জয়নাল আবেদীন দৈনিক জনবাণী পত্রিকার সংবাদকর্মী। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২ অক্টোবর তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানায় কাজ শুরু করেন জয়নাল। সেখানে বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভেজাল এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেন তিনি। পরে এসব বিষয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা পরবর্তী সময়ে একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পর মুসকান কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে ডেকে নেয় এবং পুলিশকে খবর দেয়। এরপর সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর উল্লাহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। তবে তাঁকে গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পরে সীতাকুণ্ড থানার ৫৬ নম্বর মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইনে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অনিয়ম, ভেজাল ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন, পানির পরীক্ষাগার প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। স্বাধীন পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া পানির মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহের জন্য ছদ্মবেশ ধারণের পদ্ধতি কখনো কখনো ব্যবহৃত হয়। তবে সংগৃহীত তথ্যের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে আইনানুগ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তার নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটারের মূল প্রতিষ্ঠান এস এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শাহাবুদ্দিন আলম অতীতেও ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া ঋণসংক্রান্ত মামলা ও আইনি পদক্ষেপের খবরও বিভিন্ন সময়ে এসেছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ঋণসংক্রান্ত অভিযোগে তাঁকে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গ্রেপ্তার করেছিল। ২০২৩ সালে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবরও প্রকাশিত হয়। তবে এসব অভিযোগ ও মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা এখানে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তাঁকে গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি এবং কারখানার বোতলজাত পানির মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, সাংবাদিক এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা জরুরি।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রকাশ গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়াও সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
এ ঘটনায় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আইনগত ভিত্তি এবং মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা ও আইনি দায় নির্ধারণ করতে হবে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে।