কালান্তর নিউজ ডেস্ক
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ধর্মের বুলি নয়, কাজে প্রমাণ হোক নৈতিকতা

সুদ-ঘুষ, দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে চাই নৈতিক জাগরন

ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করা আর ধর্মের নৈতিক শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। মানুষ ইবাদত করবে, স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করবে, একই সঙ্গে মানুষের অধিকার রক্ষা করবে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকবে, এটাই ধর্মীয় নৈতিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

অথচ আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, একদিকে ইবাদত ও ধর্মীয় পরিচয়ের চর্চা, অন্যদিকে সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের অনিয়মের বিস্তার। এই বৈপরীত্য আমাদের আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

প্রশ্ন হলো, ইবাদত যদি মানুষের বিবেককে জাগ্রত না করে, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ না করে এবং অন্যের অধিকার রক্ষার শিক্ষা আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই ইবাদতের নৈতিক প্রভাব জীবনে কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে?

ইবাদত মানুষের আত্মশুদ্ধি, সংযম ও নৈতিকতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেই একজন মানুষ সব ধরনের অন্যায় থেকে মুক্ত হয়ে যান, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। মানুষের প্রকৃত নৈতিক অবস্থান প্রকাশ পায় তার কাজ, আচরণ, সততা এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে।

সমাজে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁরা ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করেন, ধর্মের কথা বলেন, অথচ তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি কিংবা মানুষের অধিকার হরণের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই জরুরি; তবে প্রমাণিত অন্যায়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। অপরাধের বিচার হওয়া উচিত প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে, পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।

অন্যায়ের বিস্তারের পেছনে শুধু প্রত্যক্ষ অপরাধীর ভূমিকাই বিবেচ্য নয়। যাঁরা জেনেশুনে অপরাধে সহযোগিতা করেন, অন্যায়কারীদের রক্ষা করেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গান কিংবা অপরাধকে প্রশ্রয় দেন, তাঁদের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

তবে কোনো পেশা, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করানো ন্যায়সংগত নয়। দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রত্যেকের নিজস্ব কাজ ও ভূমিকার ভিত্তিতে।

টুপি-পাঞ্জাবি, দাড়ি কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় পরিচয় মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও অনুশীলনের অংশ হতে পারে। কিন্তু এসব পরিচয় অন্যায় করার অনুমতি দেয় না, নৈতিক জবাবদিহি থেকেও কাউকে মুক্ত করে না।

একইভাবে, বাহ্যিক পরিচয় দেখে কাউকে অপরাধী ভাবাও যুক্তিসংগত নয়। একজন মানুষের সততা ও নৈতিকতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর বাস্তব কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে।

ধর্মের নৈতিক শিক্ষা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা প্রতিফলিত হতে হবে ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক আচরণ এবং মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে।

অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ না করা, ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকা, দুর্বল মানুষের ওপর জুলুম না করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া নৈতিক জীবনের অপরিহার্য অংশ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ইবাদত ও নৈতিক আচরণ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। ধর্মীয় অনুশীলনের পাশাপাশি সততা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার চর্চা জরুরি।

সমাজে অন্যায় কমাতে হলে ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনার পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, অপরাধের যথাযথ বিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাও নিশ্চিত করতে হবে।

ধর্মের কথা বলা সহজ, কিন্তু ধর্মের নৈতিক শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত পরীক্ষা।

মসজিদে ইবাদত করার পাশাপাশি মসজিদের বাইরেও মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে। কারণ মানুষের হক নষ্ট করে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে কিংবা অন্যায়ের সুবিধাভোগী হয়ে নৈতিকতার দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

এখন সময় শুধু অন্যের ভুল খোঁজার নয়, নিজের বিবেকের কাছেও প্রশ্ন রাখার। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায় পরিহার করি, মানুষের অধিকারকে সম্মান করি এবং সততা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াই, তাহলেই একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার পথ সুগম হবে।

রবিউল ইসলাম
লেখক, কালান্তর নিউজ
খুলনা

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ: খুলনায় জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক ফাহিম মিয়া স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত

১

Nouveau casino en ligne : les limites et les règles de jeu responsable

২

Spotify Review 2026

৩

গঙ্গাচড়ায় ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জামায়াতের বিক্ষোভ, কঠোর হুঁশিয়ারি

৪

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে শিবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ

৫

রাজশাহীতে চোরাই ল্যাপটপ ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

৬

শতবর্ষী বিদ্যালয়ের মাঠে ড্রেন নির্মাণ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

৭

ছাত্রদল কর্মীর জীবনের দাম কি ২০ লাখ টাকা? জুলাই যোদ্ধা শাকিল হত্যা ও এমপি পুত্র গ্রেপ্তার নিয়ে যা জানা গেল

৮

মাদ্রাসা শিক্ষককে পেটানোই সমাধান নয়, অপরাধীর পরিচয় ধর্ম নয়, অপরাধীই: সাম্প্রদায়িক ট্যাগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ

৯

রাজশাহীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে, পুনর্বাসিত হবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

১০

নোবিপ্রবিতে নবীনবরণ ৭ নভেম্বর, থাকছেন নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা

১১

তাড়াইলে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট, ২ হাজার ৬০০ টাকাতেও মিলছে না সিলিন্ডার

১২

বাঘারপাড়ার জহুরপুরে ২০০ বছরের প্রাচীন বটগাছ, প্রকৃতির অনন্য তোরণ

১৩

খুলনায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ পালিত: আলোচনা সভা ও মানববন্ধন

১৪

ডিপিসি সম্পন্ন, তবু পদোন্নতির জিও নেই: অপেক্ষায় ৩৭তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডার

১৫

নবীনগরে গাছের চারা লাগানো নিয়ে বিরোধ, বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

১৬

সুন্দরবনে জাহাজের ধাক্কায় ডুবল কয়লাবাহী কার্গো, তলিয়ে গেল ১,২৫০ টন কয়লা

১৭

মিরসরাইয়ের নতুন ইউএনও মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, জনসেবায় বাড়ছে প্রত্যাশা

১৮

নির্বাচন কমিশনকে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় জোটের

১৯

টঙ্গীর শিশু নিপীড়ন বিতর্কে নতুন মোড়, দেশ ছাড়ার দাবি শিশুটির বাবার

২০