সমাজ ও পারিবারিক সম্পর্কের চরম অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে রাজধানীর মিরপুরে। মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের অন্তত সাত থেকে আট দিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
গত রোববার (১ জুন) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের একটি ফ্ল্যাট থেকে পল্লবী থানা পুলিশ এই মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়।
কয়েকদিন পর মিলল সন্ধান, ঘরভর্তি আবর্জনা:
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, নুরজাহান বেগম তাঁর মেয়ের বাসায় থাকতেন। তবে তিনি একটি আলাদা কক্ষে একাকী অবস্থান করতেন। কয়েকদিন ধরে ওই কক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তাঁর মেয়ে একজন নার্সকে ডেকে আনেন। ওই নার্স কক্ষে প্রবেশ করে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান এবং পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ঘরের ভেতর পড়ে থাকায় মরদেহে পচন ধরেছিল এবং পুরো কক্ষে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। যে ঘরটিতে ওই বৃদ্ধা থাকতেন, সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন, অগোছালো ও আবর্জনায় ভরা। ঘটনাস্থলের এই কঙ্কালসার অবস্থা দেখে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা—দীর্ঘদিন ধরে তিনি চরম অবহেলা, একাকীত্ব ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে ভুগছিলেন।
ছেলেরা সমাজে উচ্চ প্রতিষ্ঠিত:
পুলিশের অনুসন্ধানে এই বৃদ্ধার পারিবারিক পরিচয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো। নিহত নুরজাহান বেগমের তিন ছেলেই সমাজে উচ্চ প্রতিষ্ঠিত। তাদের একজন সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং অন্যজন কানাডাপ্রবাসী। এছাড়া তাঁর মেয়ের জামাতাও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সমাজে এত উচ্চশিক্ষিত ও প্রভাবশালী সন্তান থাকার পরও নিজ কক্ষে মায়ের এমন করুণ ও নিঃসঙ্গ মৃত্যু পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ওসি মো. হাসান বাসির বলেন, বৃদ্ধার মৃত্যুর সঠিক সময় ও কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা কোনো সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি। এ কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর আসল কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এই ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যু বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।