গ্যাস স্টেশন বন্ধের অভিযোগ, ভাড়া নিয়ে উদ্বেগ, বিকল্প গণপরিবহন না থাকায় চাপে নগরবাসী
খুলনা মহানগরীতে গণপরিবহন সংকট দীর্ঘদিনের। একসময় নগরবাসীর অন্যতম প্রধান ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল ‘টাউন সার্ভিস’ বাস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই ব্যবস্থা না থাকায় নগরবাসীর বড় একটি অংশ সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক ও বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
এর মধ্যে গ্যাস সরবরাহে সংকট ও বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে জ্বালানি পেতে ভোগান্তির অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে যাত্রীদের মধ্যে ভাড়া বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসীর প্রশ্ন, বিকল্প গণপরিবহন না থাকলে জ্বালানি সংকটের অতিরিক্ত চাপ শেষ পর্যন্ত বহন করবে কারা?
আগস্ট ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, প্রায় ১৮ লাখ মানুষের খুলনা শহরে বর্তমানে কার্যকর নগর গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। ২০০৫ সালের পর থেকে নগরীতে টাউন সার্ভিস বাস আর দেখা যায় না।
অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ফুলতলা–খুলনা রুটে সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া বাড়ার খবরও প্রকাশিত হয়। তখন স্টেশনপ্রতি ৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছিল।
দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব সিএনজি খাতেও পড়েছে। জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বেশ কিছু সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকা এবং চালু স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারির খবর প্রকাশিত হয়।
এর ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ওই সময়ে সিএনজিচালিত যানবাহনের জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
এদিকে সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠন কমিশনসহ বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী স্টেশন বন্ধের যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, ২৬ সেপ্টেম্বর সরকারের আশ্বাসের পর তা স্থগিত করা হয়। ফলে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের স্টেশন বন্ধের কর্মসূচি কার্যকর হয়নি।
খুলনার নগরবাসীর অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় সিএনজি স্টেশন বন্ধ, কোথাও সরবরাহ সীমিত এবং কোথাও জ্বালানি নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তবে কোনো স্টেশন ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে কি না, কিংবা গ্যাসের চাপ, সরকারি সময়সূচি, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বা অন্য কোনো কারণে স্টেশন বন্ধ রয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ কারণে নগরীর সিএনজি স্টেশনগুলো নিয়ে প্রশাসনিকভাবে তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে জানা প্রয়োজন—
সিএনজি সংকটের কারণে ভাড়া বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন অনেক যাত্রী। তবে ২৩ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই এবং ভাড়া বাড়ানো হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ অবস্থায় খুলনায় কোনো চালক বা মালিক সমিতি অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করলে সেটি সরকারি অনুমোদিত ভাড়া কি না, নাকি স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত বা আদায় করা ভাড়া, তা যাচাই করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
খুলনার বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী নগর গণপরিবহনের অভাব।
টাউন সার্ভিস বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নগরবাসীর একটি বড় অংশ ইজিবাইক, সিএনজি ও অন্যান্য থ্রি-হুইলারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে যাত্রীদের যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর।
এ অবস্থায় খুলনা মহানগরীতে পরিকল্পিতভাবে টাউন সার্ভিস বাস পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নিয়মিত নগর বাসসেবা চালু হলে সিএনজিসহ ছোট যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
১. খুলনা মহানগরীতে বর্তমানে মোট কতটি সিএনজি স্টেশন সক্রিয় রয়েছে?
২. গত এক মাসে কোন কোন স্টেশন কতদিন বন্ধ ছিল এবং কী কারণে?
৩. সরকারি নির্ধারিত চার ঘণ্টার বাইরে কোনো স্টেশন বন্ধ রাখার অনুমতি রয়েছে কি না?
৪. সিএনজি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কীভাবে চলছে?
৫. খুলনায় টাউন সার্ভিস বাস পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রশাসন, সিটি করপোরেশন বা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না?
জ্বালানি সরবরাহের সংকটের চাপ যখন নগর পরিবহনে সরাসরি পড়ছে, তখন খুলনার মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা কতটা জরুরি, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সিএনজি স্টেশন বন্ধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি স্টেশনভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের তথ্য প্রকাশ, ভাড়া নিয়ন্ত্রণে নজরদারি এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নগর গণপরিবহন ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা এখন জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং খুলনায় সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।