এটি মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবি নয়, ফিলিস্তিনেরও নয়। ছবিটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পরের—১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের নির্মম বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও গবেষণাভিত্তিক হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। সরকারি হিসাবে কয়েক হাজার মৃত্যুর কথা বলা হলেও গবেষক মহিউদ্দীন আলমগীরের বহুল উদ্ধৃত হিসাব এবং সাম্প্রতিক নানা গবেষণা অনুযায়ী দুর্ভিক্ষ ও অনাহারজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।
এই ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দলিলগুলোর একটি কবি রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো’ কবিতাটি। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা এই কবিতাটি ক্ষুধার্ত মানুষের অসহায় আর্তনাদ ও রাষ্ট্রের কাছে বেঁচে থাকার অধিকার দাবি করার এক তীব্র প্রতিবাদী উচ্চারণে পরিণত হয়েছিল।
“ভাত দে হারামজাদা,
নইলে মানচিত্র খাবো”—
এই একটি পঙ্ক্তিই যেন সেই সময়ের বাংলাদেশের ক্ষুধার্ত মানুষের সমস্ত ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও হতাশাকে ধারণ করে। স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা, একটি মানচিত্র কিংবা একটি রাষ্ট্রের নাম নয়। স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় অর্থ—মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, অন্নের অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ নিয়ে ইতিহাসে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে—বন্যা, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, বাজারব্যবস্থার সংকট, মজুত ও বণ্টনের সমস্যা এবং সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা—সবই গবেষণার আলোচনায় এসেছে। তাই ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্লোগানে সরলীকরণ না করে, সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ—দুটিই নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
রফিক আজাদের কবিতা আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়—যে স্বাধীনতার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই স্বাধীন রাষ্ট্র যদি তার ক্ষুধার্ত মানুষকে অন্ন দিতে ব্যর্থ হয়, তবে স্বাধীনতার সার্থকতা কোথায়?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। কোনো সরকার, কোনো দল কিংবা কোনো নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য ইতিহাসের বিকল্প হতে পারে না। আবার রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য ইতিহাসের তথ্যকেও বিকৃত করা উচিত নয়। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে কত মানুষ মারা গিয়েছিল, কেন তারা মারা গিয়েছিল, রাষ্ট্র কোথায় ব্যর্থ হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে দলীয় আবেগের বাইরে গিয়ে।
কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কান্নার কোনো দলীয় পরিচয় নেই। যে শিশুটি অনাহারে মারা যায়, সে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়—সে কেবল একটি রাষ্ট্রের নাগরিক। তার মৃত্যুর দায় ইতিহাসের কাছে রাষ্ট্র ও সমাজেরই।
ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কঙ্কাল, পুরোনো সংবাদপত্রের ছবি, গবেষণার নথি আর একজন কবির প্রতিবাদী কলম—সবকিছু একসঙ্গে মুছে ফেলা যায় না। ১৯৭৪ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা যুদ্ধের ময়দানে শেষ হয় না; স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার সময়।
ইতিহাস তাই শুধু গৌরবের গল্প নয়; ইতিহাস আত্মসমালোচনারও আয়না। আর সেই আয়নায় ১৯৭৪-এর বাংলাদেশ আজও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।