সংসারের তীব্র অভাব-অনটন দূর করতে ও একটু ভালো থাকার আশায় ঢাকার এক প্রকৌশলীর বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে পাঠানো হয়েছিল ১২ বছরের শিশু রিক্তা মনিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবিত রিক্তা আর বাড়ি ফিরতে পারেনি, তার লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে বাবা-মায়ের কাছে। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর ধানমন্ডিতে।
নিহত রিক্তা মনি সুনামগঞ্জের শাল্লা (সালনা) উপজেলার নিজগাঁও গ্রামের দিনমজুর শাহিন মিয়া ও মাজেদা বেগম দম্পতির মেয়ে। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। পরিবারের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে গাজিবুর ও আইয়ুব আলী নামে দুই দালালের মাধ্যমে মাসে ৪ হাজার টাকা বেতনে রিক্তাকে ঢাকার ধানমন্ডিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী সবিবুর রহমান ও তার স্ত্রী নুসরাত বর্ণির বাসায় কাজ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগের বিনিময়ে দুই দালাল ১০ হাজার টাকা বখশিস পেয়েছিল।
কাজে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরই রিক্তা ইমো কলে মাকে কান্নাকাটি করে জানায়, তার ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তার মুখ ও চোখ ফোলা দেখে মা গৃহকর্ত্রী বর্ণির কাছে মেয়েকে ফেরত চান। কিন্তু বর্ণি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দালালকে দেওয়া ১০ হাজার টাকা ফেরত না দিলে রিক্তাকে ছাড়বেন না। টাকা দিতে রাজি হওয়ার পরও গত ১৯ জুন সকালে পরিবারকে জানানো হয় রিক্তা হাসপাতালে ভর্তি। পরবর্তীতে স্বজনরা হাসপাতালে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে রিক্তার ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখতে পান। তার বাম হাত ভেঙে মাংসপেশি ছিঁড়ে হাড় বেরিয়ে ছিল।
অভিযোগ ওঠে, শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে রিক্তাকে ১১ তলার বারান্দা থেকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা শাহিন মিয়া বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ প্রকৌশলী সবিবুর ও বর্ণিকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে পাঠায়।
তবে ঘটনার মোড় ঘোরে মাত্র দুই সপ্তাহ পর। গত ৭ জুলাই আসামিরা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। আদালতে বাদীপক্ষ হঠাৎ দাবি করে, তারা ভুল বুঝে মামলা করেছিলেন এবং মেয়ে নাকি আত্মহত্যা করেছে! মামলায় আসামিদের জামিনে কোনো আপত্তি জানাননি বাবা-মা। সাংবাদিকরা আপসের বিষয়টি জানতে চাইলে বাদীপক্ষের আইনজীবী অসঙ্কোচে মন্তব্য করেন, “এ ধরনের মামলা টাকা ছাড়া কি আপস হয়?”
১০ হাজার টাকায় কাজ শুরু করা ১২ বছরের রিক্তা মনির মৃত্যু শেষ পর্যন্ত কত টাকায় রফা হলো, সেই প্রশ্ন এখন পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।