জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চোখে আলো না থাকলেও স্বপ্ন দেখার শক্তিতে কোনো ঘাটতি নেই। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মোহাম্মদ ইমন ফকির।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল ইমনের। ব্রেইল পদ্ধতিতে শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। বরিশালের একটি সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের হোস্টেলে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে এক শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান ইমন। ভর্তি হন সরকারি বাঙলা কলেজে। সেখান থেকেই ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন।
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পাঠ্যবইয়ের ব্রেইল সংস্করণ না থাকায় পড়াশোনায় বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। বিকল্প হিসেবে পিডিএফ ফাইল ও গুগলের বিভিন্ন সফটওয়্যারের সহায়তায় প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিবন্ধকতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে ইমনকে। অনেক সময় কাছের মানুষদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত মানসিক সহযোগিতা পাননি। অবসরে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেই আগ্রহ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অবসর সময়ের বড় একটি অংশ বই ও জার্নাল পড়েই কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাধারণত পরীক্ষায় অংশ নিতে শ্রুতিলেখকের সহায়তা নিতে হয়। একজন উপযুক্ত শ্রুতিলেখক খুঁজে বের করা এবং পরীক্ষার আগে তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি মানসিক চাপ ও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ বিষয়ে কালান্তর নিউজকে ইমন বলেন, “আমাদের বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি মোটেও প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। শ্রুতিলেখক খোঁজার এই বিড়ম্বনা চরম হয়রানির।”
এই সমস্যা সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ইমনের মতে, জাপানে এমন আধুনিক ব্রেইল মেশিন রয়েছে, যেখানে ব্রেইলে টাইপ করা লেখা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ লেখা বা টেক্সটে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা হলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেরাই উত্তর লিখতে পারবেন।
এ বিষয়ে ইমন বলেন, “রাষ্ট্র চাইলে খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। আমাদের দেশেও যদি এই প্রযুক্তি আনা হয়, তবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের আর পরীক্ষার হলে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না। তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের মেধার প্রমাণ দিতে পারবে।”
এইচএসসিতে অসাধারণ সাফল্যের পর এবার ইমনের লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশের প্রথম সারির কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হওয়া অথবা শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। পাশাপাশি নিজের মতো প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে চান।
ইমনের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও প্রতিবন্ধীবান্ধব করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেন কোনো শিক্ষার্থীর মেধা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, সহায়ক শিক্ষা উপকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
চোখে আলো নেই, তবু স্বপ্নের আলোয় আলোকিত ইমনের পথচলা। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব।