সুদ-ঘুষ, দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে চাই নৈতিক জাগরন
ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করা আর ধর্মের নৈতিক শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। মানুষ ইবাদত করবে, স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করবে, একই সঙ্গে মানুষের অধিকার রক্ষা করবে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকবে, এটাই ধর্মীয় নৈতিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
অথচ আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, একদিকে ইবাদত ও ধর্মীয় পরিচয়ের চর্চা, অন্যদিকে সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের অনিয়মের বিস্তার। এই বৈপরীত্য আমাদের আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
প্রশ্ন হলো, ইবাদত যদি মানুষের বিবেককে জাগ্রত না করে, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ না করে এবং অন্যের অধিকার রক্ষার শিক্ষা আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই ইবাদতের নৈতিক প্রভাব জীবনে কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে?
ইবাদত মানুষের আত্মশুদ্ধি, সংযম ও নৈতিকতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেই একজন মানুষ সব ধরনের অন্যায় থেকে মুক্ত হয়ে যান, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। মানুষের প্রকৃত নৈতিক অবস্থান প্রকাশ পায় তার কাজ, আচরণ, সততা এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে।
সমাজে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁরা ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করেন, ধর্মের কথা বলেন, অথচ তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি কিংবা মানুষের অধিকার হরণের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই জরুরি; তবে প্রমাণিত অন্যায়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। অপরাধের বিচার হওয়া উচিত প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে, পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।
অন্যায়ের বিস্তারের পেছনে শুধু প্রত্যক্ষ অপরাধীর ভূমিকাই বিবেচ্য নয়। যাঁরা জেনেশুনে অপরাধে সহযোগিতা করেন, অন্যায়কারীদের রক্ষা করেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গান কিংবা অপরাধকে প্রশ্রয় দেন, তাঁদের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
তবে কোনো পেশা, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করানো ন্যায়সংগত নয়। দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রত্যেকের নিজস্ব কাজ ও ভূমিকার ভিত্তিতে।
টুপি-পাঞ্জাবি, দাড়ি কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় পরিচয় মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও অনুশীলনের অংশ হতে পারে। কিন্তু এসব পরিচয় অন্যায় করার অনুমতি দেয় না, নৈতিক জবাবদিহি থেকেও কাউকে মুক্ত করে না।
একইভাবে, বাহ্যিক পরিচয় দেখে কাউকে অপরাধী ভাবাও যুক্তিসংগত নয়। একজন মানুষের সততা ও নৈতিকতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর বাস্তব কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে।
ধর্মের নৈতিক শিক্ষা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা প্রতিফলিত হতে হবে ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক আচরণ এবং মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে।
অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ না করা, ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকা, দুর্বল মানুষের ওপর জুলুম না করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া নৈতিক জীবনের অপরিহার্য অংশ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইবাদত ও নৈতিক আচরণ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। ধর্মীয় অনুশীলনের পাশাপাশি সততা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার চর্চা জরুরি।
সমাজে অন্যায় কমাতে হলে ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনার পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, অপরাধের যথাযথ বিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাও নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্মের কথা বলা সহজ, কিন্তু ধর্মের নৈতিক শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত পরীক্ষা।
মসজিদে ইবাদত করার পাশাপাশি মসজিদের বাইরেও মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে। কারণ মানুষের হক নষ্ট করে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে কিংবা অন্যায়ের সুবিধাভোগী হয়ে নৈতিকতার দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এখন সময় শুধু অন্যের ভুল খোঁজার নয়, নিজের বিবেকের কাছেও প্রশ্ন রাখার। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায় পরিহার করি, মানুষের অধিকারকে সম্মান করি এবং সততা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াই, তাহলেই একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার পথ সুগম হবে।
রবিউল ইসলাম
লেখক, কালান্তর নিউজ
খুলনা