ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দীর্ঘ লাইন, গাদা গাদা ফরম পূরণ আর অন্তহীন নথিপত্রের ধকল। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে যাচ্ছে সেই চেনা ছবি। এখন মোবাইল ফোনের কয়েকটি ক্লিকেই ঋণের আবেদন, যাচাই-বাছাই থেকে শুরু করে সরাসরি নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের আধুনিক এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাকেই বলা হচ্ছে “ই-লোন” বা ডিজিটাল ঋণ।
বাংলাদেশেও এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক টানতে এই ডিজিটাল ঋণের পরিধি বাড়াচ্ছে। গত ১১ মে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) এই সংক্রান্ত একটি যুগান্তকারী নীতিমালা বা সার্কুলার জারি করেছে। ফলে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যাংকিং খাতে ই-লোন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ই-লোন আসলে কী?
সহজ কথায়, ই-লোন হলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও অনলাইনভিত্তিক একটি ঋণপ্রক্রিয়া। যেখানে আবেদন থেকে শুরু করে ঋণ অনুমোদন এবং বিতরণ—পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর জন্য গ্রাহককে ব্যাংকের কোনো শাখায় স্বশরীরে যেতে হয় না। গ্রাহক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে যেকোনো সময় ঋণের আবেদন করতে পারেন। ব্যাংকগুলো গ্রাহকের পূর্বের আর্থিক তথ্য, লেনদেনের ইতিহাস ও ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোর বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়।
ধারণাটি কি বাংলাদেশে নতুন?
না, বাংলাদেশে ডিজিটাল ঋণের ধারণাটি একদম নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে দেশের একটি শীর্ষ সারির মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে এই ই-লোন সেবা দিয়ে আসছিল।
এ বিষয়ে দেশের সফটওয়্যার ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের সংগঠন বেসিসের সাবেক সভাপতি এবং বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, “এটা নতুন কিছু না। বিকাশ আর সিটি ব্যাংক মিলে যেটা করে, এটা সেটাই। লোন দেয় সিটি ব্যাংক, কিন্তু বিকাশের মাধ্যমে অ্যাপ্লাই করা যায়। শুরুতে এটি ২০ হাজার টাকার সীমা থাকলেও এখন ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।”
তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলারের মূল গুরুত্ব হলো—এখন থেকে দেশের যেকোনো ব্যাংক এই নিয়মের আওতায় নিজস্ব উদ্যোগে ই-লোন দিতে পারবে।
মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিনও বিষয়টিকে সমর্থন করে বলেন, “ই-লোন হলো মূলত ঋণ দেওয়ার একটা ‘প্রসেস’ (পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া), এটি আলাদা কোনো ‘ক্যাটাগরি অব লোন’ না। সিএমএসএমই (কটেজ, মাইক্রো, স্মল, মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস) ক্যাটাগরির মাঝেই এই ই-লোন ডিজিটালি বিতরণ করা যাবে।”
কী কী শর্তে মিলবে এই ই-লোন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সেবার নাম বাধ্যতামূলকভাবে ‘ই-লোন’ হতে হবে। এর প্রধান শর্তগুলো হলো:
ঋণের সর্বোচ্চ সীমা: একজন গ্রাহক কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই ঋণ নিতে পারবেন।
মেয়াদ: এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১ বছর বা ১২ মাস।
সুদের হার: এ ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হবে। তবে কোনো ব্যাংক যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় এই ঋণ দেয়, তবে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ।
ডিজিটাল সম্মতি: এই ঋণ পেতে গ্রাহককে কোনো কাগজের দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে না। বায়োমেট্রিক তথ্য ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) ব্যবহার করে গ্রাহকের সম্মতি নেওয়া হবে।
সিআইবি চার্জ ফ্রি: ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংক গ্রাহকের আগের রেকর্ড বা সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট যাচাই করবে। তবে ই-ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি অনুসন্ধানের জন্য গ্রাহকের কোনো অতিরিক্ত চার্জ লাগবে না।
খেলাপিদের জন্য নিষেধাজ্ঞা: কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি এই ডিজিটাল ঋণ সুবিধা পাবেন না।
প্রান্তিক মানুষের সুবিধা কোথায়?
৫০ হাজার টাকার অংকটি খুব বড় না হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন প্রান্তিক মানুষের জন্য এটি দারুণ কার্যকরী হবে। মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, “এনজিও’র কাছে গেলে চড়া সুদে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি শোধ করতে হয়। তার চেয়ে ব্যাংকের এই ব্যবস্থায় এক বছরে সুদের চাপ অনেক কম থাকবে। ৫০ হাজার টাকা প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় সাপোর্ট, যা দিয়ে একটি গরু কিনেও কোরবানিতে লাভসহ বিক্রি করা সম্ভব।”
ফাহিম মাশরুরও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, “ক্রেডিট কার্ডের জন্য অনেক বেশি ডকুমেন্টস এবং নির্দিষ্ট আয়ের বা চাকুরিজীবী হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু ই-লোনের ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থাকলেই প্রান্তিক মানুষ, শিক্ষার্থী বা ছোট ব্যবসায়ীরা সহজেই এই ঋণ পেতে পারেন।”
বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের সার্কুলারে জানিয়েছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনে একটি ‘ক্যাশলেস’ বা নগদবিহীন সমাজ বিনির্মাণে ই-লোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ঝুঁকির জায়গাগুলো কোথায়?
ই-লোনের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকির জায়গাটি মূলত ব্যাংকের জন্য, গ্রাহকের নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামানতবিহীন ও ছোট অংকের এই ঋণে ৯ শতাংশ সুদের সীমা থাকলে ব্যাংকগুলো খুব বেশি আগ্রহী নাও হতে পারে।
ফাহিম মাশরুর ব্যাখ্যা করে বলেন, “যেহেতু এখানে কোনো বন্ধক বা সিকিউরিটি থাকে না, তাই কেউ লোন ফেরত না দিলে ব্যাংকের লোকসান হয়। রিস্ক কভার করার জন্য বিশ্বজুড়ে এই ধরনের মাইক্রো বা ডিজিটাল লোনে ইন্টারেস্ট রেট একটু বেশি (২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত) রাখা হয়, যেন ১০ জনের মধ্যে ২ জন টাকা না দিলেও ব্যাংকের লোকসান না হয়। এছাড়া ছোট ছোট ঋণের গ্রাহক ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকের আলাদা পরিচালনা খরচও থাকে।”
তবে ঝুঁকি থাকলেও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে ই-লোন একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।