ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকারের গবাদি পশু জবাইসংক্রান্ত কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে পশুর হাটগুলোতে তীব্র ধস নেমেছে। কোরবানির ঈদের আগে এই বিধিনিষেধ কার্যকরের ফলে রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্রেতা ও বেপারিদের মধ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও আইনি আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আইনি জটিলতার ভয়ে অনেকেই এবার হাটে যাচ্ছেন না, যার ফলে পশুর হাটগুলো এখন সম্পূর্ণ ক্রেতাশূন্য।
তবে এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রাজ্যের লাখ লাখ প্রান্তিক হিন্দু গো-খামারিদের ওপর। সারা বছর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কোরবানির মৌসুমকে টার্গেট করে গরু লালন-পালন করা এই হিন্দু খামারিরা এখন মহাবিপাকে পড়েছেন। লোকসানের মুখে পড়ে এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন জেলার অনেক হিন্দু খামারি বিষ খেয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এমনকি ক্ষুব্ধ খামারিরা দাবি তুলেছেন, সাধারণ মানুষ যদি গরু কিনতে না পারে, তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেই সব গরু কিনে নিতে হবে।
কী আছে নতুন সরকারি আদেশে?
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদি পশু পরিবহন ও হাটের ওপর কড়া প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। রাজ্য সরকার মূলত ১৯৫০ সালের ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এবং ২০১৮ সালের কলকাতা হাইকোর্টের একটি নির্দেশিকাকে কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, পুরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসক যৌথভাবে লিখিত ‘ফিট ফর স্লটার’ সার্টিফিকেট দিলেই কেবল কোনো বলদ, গরু বা মহিষ জবাই দেওয়া যাবে। এই সার্টিফিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হলো—পশুটির বয়স অন্তত ১৪ বছরের বেশি হতে হবে অথবা বার্ধক্য, আঘাত বা অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হতে হবে। একই সাথে গর্ভবতী কোনো পশু জবাই করা এবং প্রকাশ্য স্থানে বা রাস্তাঘাটে কোরবানি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
‘গরুর কি বার্থ সার্টিফিকেট আছে?’– বয়স নির্ধারণের নিয়মে ক্ষোভ
সরকারের এই নতুন আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন খামারি ও জনপ্রতিনিধিরা। পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী বিধায়ক হুমায়ুন কবির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, “পশু কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সেটা ১৪ বছরের হতে হবে—এটা কীভাবে নিশ্চিত হবে? গরুর কি বার্থ সার্টিফিকেট আছে? তাহলে প্রশাসন কীভাবে তার বয়স নির্ধারণ করবে? এক বছর সময় দিলেও কি সরকার পশ্চিমবঙ্গের সব গরুর বার্থ সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারবে?”
তিনি আরও জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন, মুসলিম সমাজ যেন জনসমক্ষে কিছু না করে নির্দিষ্ট বা ঘিরে রাখা স্থানে কোরবানির কাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু কিছু পুলিশ কর্মকর্তা অতি-উৎসাহী হয়ে ১৪ বছরের বয়স প্রমাণের মতো অতিরঞ্জিত নির্দেশিকা দিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি ছড়াচ্ছেন।
আয়ের চাকা থমকে গেছে, বিষ খেয়ে মরার হুমকি খামারিদের:
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মুর্শিদাবাদের ডোমকল পশুর হাটসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তিক হাট সম্পূর্ণ বন্ধ ও ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে। ডোমকল হাটের এক প্রান্তিক হিন্দু খামারি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমাদের এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চলে। বিক্রি না হলে গরু মাঠে ছেড়ে দিতে হবে, আর আমাদের বিষ খেয়ে মরতে হবে। আমাদের তো চরম ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।”
ক্ষুব্ধ খামারিরা চরম হতাশায় সরাসরি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের নীতিকে আক্রমণ করে বলছেন, “মোদিকে সব গরু কিনতে হবে, গরু কিনে চাষিকে টাকা দিতে হবে। আমরা গরু বেচে খাই, গরু বেচে চাষ করি। মোদি যে ব্যবস্থাটা করেছেন, এ অবস্থায় তিনি ঘরে ঘরে একটা-দুটো করে চাকরি দিন, নয়তো এই গরু মোদি নিজেই কিনে নিক।”
খামারিদের দাবি, গরুর স্বাভাবিক গড় আয়ু এমনিতেই ১২ থেকে ১৫ বছর হয়। ১৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার পর সেই বৃদ্ধ বা অকেজো পশুর যত্ন নেওয়ার মতো সামর্থ্য আর সাধারণ কৃষকদের থাকে না।
রপ্তানিতে শীর্ষ ৩-এ ভারত, নীতিবৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন:
অভ্যন্তরীণ বাজারে যখন সাধারণ প্রান্তিক খামারিদের ওপর কড়া বিধিনিষেধ চালানো হচ্ছে, তখন ভারত সরকারের নিজস্ব তথ্য এক বিশাল নীতিবৈষম্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA) ও ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গো-মাংস (মূলত মহিষের মাংস) রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে শীর্ষ তিনের মধ্যে অবস্থান করছে। ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে ভারত থেকে প্রতিবছর গড়ে ১২ থেকে ১৫ লাখ টন মাংস আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়েছে এবং ২০blank৬ সালে এটি ১৭ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
প্রতি বছর ভারত সরকার গবাদি পশুর মাংস রপ্তানি করে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫,০০০ কোটি রুপিরও বেশি) রাজস্ব আয় করে। ভারতের উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্রপ্রদেশের বড় বড় করপোরেট কসাইখানা থেকে এই প্রক্রিয়াজাত মাংস মূলত ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে খামারি ও সমালোচকদের প্রশ্ন, বড় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো যখন মাংস বিদেশে রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকা লাভ করছে, তখন দেশের ভেতরের প্রান্তিক হিন্দু-মুসলিম চাষিরা কেন সামান্য পশু বিক্রি করতে গিয়ে আইন ও ঋণের জালে জড়িয়ে দেউলিয়া হবেন?