সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে হরিণশিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে গুরুতর আহত হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে সেই বাঘিনী। দীর্ঘ চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা শেষে আগামীকাল রোববার (১২ জুলাই) বাঘিনীটিকে পুনরায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করতে যাচ্ছে বন বিভাগ। তবে বনের স্বাভাবিক জীবনে তার টিকে থাকা এবং নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবন থেকে অত্যন্ত গুরুতর ও কঙ্কালসার অবস্থায় বাঘিনীটিকে উদ্ধার করা হয়। এরপর খুলনা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে রেখে চলে দীর্ঘ চিকিৎসা। সামনের বাঁ পায়ের গভীর ক্ষত শুকিয়ে যাওয়া এবং শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ায় মেডিক্যাল বোর্ড তাকে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বাগেরহাটের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে পুনরায় প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
পুরনো এলাকায় আধিপত্য ও সংঘাতের ঝুঁকি
দীর্ঘ সময় খাঁচাবন্দি থাকার পর বাঘিনীটির স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবাদীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের নিজস্ব বিচরণ এলাকা থাকে। দীর্ঘদিন এই বাঘিনীটি বনে অনুপস্থিত থাকায় তার পুরনো এলাকায় অন্য কোনো বাঘের আধিপত্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ফলে অবমুক্তির পর এলাকা দখল নিয়ে অন্য বাঘের সাথে প্রাণঘাতী সংঘাতের চরম ঝুঁকি রয়েছে।
নিরাপত্তায় ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা
স্যাটেলাইট কলারের অভাব থাকায় বাঘিনীটির নিরাপত্তা ও গতিবিধি নিশ্চিত করতে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে বন বিভাগ। অবমুক্তির এলাকায় প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খুলনা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ১০টি ক্যামেরা বসানো সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকিগুলো অবমুক্তির আগেই স্থাপন করা হবে।
তবে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খানের মতে, কেবল ক্যামেরা ট্র্যাপ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যথেষ্ট নয়; অবমুক্তির আগে তার শিকারের প্রাপ্যতা এবং ওই এলাকার পরিবেশগত উপযোগিতা সম্পর্কে আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ছিল।
ভবিষ্যতের জন্য বড় পরীক্ষা
সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে বাঘের মতো শীর্ষ শিকারি প্রাণীর পুনঃপ্রবর্তন সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ইতিবাচক হলেও, এর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এই বাঘিনীটির বিচরণ ও বেঁচে থাকার লড়াই ভবিষ্যতে বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কেবল অবমুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, পরবর্তী কয়েক মাস ক্যামেরা ট্র্যাপের তথ্যের ভিত্তিতে বাঘিনীটির অভিযোজন ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করাই হবে বন বিভাগের মূল চ্যালেঞ্জ।