সুন্দরবনসংলগ্ন আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ও সরবরাহের জন্য ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং মোংলা বন্দরের আশপাশে শিল্পায়নের সম্ভাবনা তৈরির লক্ষ্যে সরকার এ উদ্যোগ বিবেচনা করছে।
তবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, নদীর পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা ও মোংলা সফরে প্রস্তাবিত টার্মিনাল এলাকার সম্ভাব্যতা পর্যালোচনার কথা রয়েছে।
একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সফরসূচির তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট আকাশপথে পর্যবেক্ষণের পর তিনি দাকোপের নলিয়ান এলাকায় যাবেন। এরপর আকরাম পয়েন্ট পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আকরাম পয়েন্ট সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা বন্দরের বহির্নোঙর ও নৌচ্যানেল এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত। বঙ্গোপসাগর থেকে মোংলা বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের জন্য এ অঞ্চলের নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন করা হলে আমদানি করা এলএনজি জাহাজে গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পুনরায় গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তরের পর পাইপলাইনে মোংলা অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মোংলা ও আশপাশের শিল্পকারখানা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, নির্মাণব্যয়, পাইপলাইনের রুট এবং পরিবেশগত গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে আমদানিনির্ভর এলএনজি অবকাঠামোর গুরুত্ব বেড়েছে। বর্তমানে মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে গ্যাস সরবরাহের ভৌগোলিক পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আকরাম পয়েন্টে টার্মিনাল স্থাপন শুধু জ্বালানি সরবরাহের বিষয় নয়। এর সঙ্গে নৌচলাচল, পাইপলাইন নির্মাণ, বিনিয়োগের ধরন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যয় এবং সুন্দরবনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও জড়িত।
১. সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য
সুন্দরবন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই অঞ্চলে যেকোনো বড় জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের আগে বন, নদী, বন্যপ্রাণী ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এলএনজি টার্মিনালে গ্যাস লিকেজ, অগ্নিকাণ্ড, জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজের কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এসব ঝুঁকির প্রকৃতি ও মাত্রা নির্ভর করবে প্রকল্পের নকশা, অবস্থান, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ওপর।
২. নদীর পানি ও জলজ প্রাণী
এফএসআরইউতে গ্যাসকে তরল অবস্থা থেকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য তাপ বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে ঠান্ডা পানি বা রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে আশপাশের পানির তাপমাত্রা ও গুণগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে পশুর ও শিবসা নদীসংলগ্ন পরিবেশ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং ডলফিনের আবাসস্থলের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা জানতে প্রকল্পভিত্তিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রয়োজন।
৩. ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের সুরক্ষা
সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা বজায় রাখা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত টার্মিনালের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যগত মূল্য, সংরক্ষণনীতি এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পটি নিয়ে ইউনেস্কোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান বা নির্দিষ্ট সতর্কবার্তা আছে কি না, তা নির্ভরযোগ্য নথি থেকে যাচাই করে প্রকাশ করা উচিত।
প্রকল্পটি ঘিরে পরিবেশগত ঝুঁকি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, পরিচালনব্যয় এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থায়ন ও পরিচালন কাঠামো, সম্ভাব্য ব্যয়-সুবিধা এবং স্থানীয় মানুষের মতামত প্রকাশ্যে আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত, স্থানীয় জেলে ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশগত সমীক্ষার ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২২ অক্টোবরের খুলনা-মোংলা সফরে সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ, মোংলা বন্দরের কার্যক্রম এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। আকরাম পয়েন্টে টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা পর্যালোচনাও সফরের আলোচিত বিষয়।
তবে স্থান পরিদর্শন মানেই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো ও শিল্পায়নের সম্ভাবনা তৈরি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাও জরুরি।
আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত মূল্যায়ন, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রবিউল ইসলাম
বিশেষ প্রতিবেদন
কালান্তর নিউজ