বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দলের আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই দাবি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফিরে তাঁরা সবাই একসাথে আদালতে আত্মসমর্পণ করার কথা ভাবছেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম শেখ হাসিনা কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বললেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে, এবং তাদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি, আর একদিন তোমরাও সবাই এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবো।” তবে ডিসেম্বরের ঠিক কবে তিনি ফিরবেন কিংবা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, কৌশলগত কারণে তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
নিজের রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সিদ্ধান্ত জনগণই নিক।” তিনি দাবি করেন, দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই অনলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১২৫টি সংসদীয় আসনের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে স্বীকার করলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায় নেননি তিনি।
আইনগতভাবে ফেরা সম্ভব কি না:
কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় শেখ হাসিনার কাছে বর্তমানে কোনো বৈধ পাসপোর্ট নেই। ফলে সরকারের ট্রাভেল পাস বা বিশেষ অনুমতি ছাড়া তাঁর স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার দেশে আসতে আইনগত কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, “একজন ফিউজিটিভের (পলাতক আসামি) পক্ষে কোনো আইনগত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নাই। তাকে অবশ্যই আসতে হবে, এই ট্রাইব্যুনালেই সারেন্ডার করতে হবে। সারেন্ডার করেই তাকে প্রথমে জেলে যেতে হবে এবং সেখান থেকে তাকে আপিল ফাইল করতে হবে।”
বিএনপি সরকারের প্রতিক্রিয়া:
শেখ হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের একটি মামলায় বিচার শেষে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরও অনেক হত্যা মামলায় আদালতে তার বিচার চলছে।” তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, সেটি তাদের দলীয় বিষয়। তবে জুলাই আন্দোলনে শিশু-কিশোর হত্যার যে মহাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, জনগণ তার সর্বোচ্চ বিচার দেখতে চায় এবং আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সেই আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে সারাদেশে ৪৫৩টি হত্যা মামলাসহ মোট ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। এর মাঝেই, ২০২৫ সালের মে মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ রয়েছে।