আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নিপীড়নের মতো ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড বন্ধে বাস্তবমুখী ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ইসলামি বক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহ। এ ধরনের অনাচার রুখতে নীরবতা ভেঙে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড ও শীর্ষ আলেমদের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
গতকাল শনিবার (২৩ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ এই আহ্বান জানান। বর্তমানে হজের সফরে সৌদি আরবে অবস্থান করায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশে ফিরে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিস্তারিত প্রস্তাবনা উপস্থাপন এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
আবাসিক মাদ্রাসায় অনাচার বন্ধে ৬ দফা পরামর্শ:
শায়খ আহমাদুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমবেশি ঘটছে—এটি একটি নির্মম সত্য। এ বিষয়ে নীরব থাকলে বা একে আড়াল করার চেষ্টা করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং অপরাধ আরও বাড়বে। ২০১৯ সালেও এ বিষয়ে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও অবকাঠামোগত পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দেন:
১. মাদ্রাসার প্রতিটি কক্ষ ও বারান্দা বাধ্যতামূলকভাবে সিসি (CC) ক্যামেরার আওতায় আনা।
২. শিক্ষকদের জন্য যথাযথ আধুনিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৩. শিক্ষকদের মানসিক সুস্থতার জন্য পারিবারিক বাসার ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ছুটির ব্যবস্থা করা।
৪. মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষ এবং আবাসন (হোস্টেল) সম্পূর্ণ আলাদা রাখা।
৫. শিক্ষার্থীদের ঢালাও বিছানার পরিবর্তে একক বা পৃথক খাটের ব্যবস্থা করা।
৬. মহিলা মাদ্রাসায় কোনোভাবেই পুরুষ শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ না দেওয়া।
‘বিশেষজ্ঞ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব:
যেকোনো মাদ্রাসায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বন্ধে এবং কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ বোর্ড ‘হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া’র প্রতি একটি বিশেষ প্রস্তাব দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি বলেন, বোর্ডের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শীর্ষ আলেম ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন ‘তদন্ত কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে। কোথাও কোনো অভিযোগ উঠলে এই কমিশন সরেজমিন তদন্ত করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে তাৎক্ষণিক আইনি বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি সে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো মাদ্রাসায় চাকরি না পায়, সেজন্য তাকে স্থায়ীভাবে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে।
মিডিয়া ট্রায়াল ও ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে:
পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মাদ্রাসায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে উল্লেখ করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের অতিউত্সাহ এবং কিছু ষড়যন্ত্রের চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বলাৎকারের ঘটনা ঘটে—এটি যেমন সত্য, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সত্যের সঙ্গে মিথ্যার মিশেল ঘটায়। আবার কোথাও কোথাও প্রভাবশালী প্রকৃত অপরাধীকে রক্ষা করতে দুর্বল ইমাম বা আলেমকে বলির পাঁঠা বানানো হয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ফেনীর একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ইমাম ও মক্তব শিক্ষককে ফাঁসানো হয়েছিল। পরে ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, শিশুটির ডিএনএর মিল ইমামের সাথে নয়, বরং কিশোরীর আপন বড় ভাইয়ের সাথে ছিল। শায়খ আহমাদুল্লাহ মনে করেন, প্রস্তাবিত কমিশনটি গঠিত হলে একদিকে যেমন প্রকৃত অপরাধ কমবে, অন্যদিকে কোনটি বাস্তব ঘটনা আর কোনটি ষড়যন্ত্র—তা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির সামনে স্পষ্ট হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি রক্ষা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখতে কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এই আত্মশুদ্ধিমূলক ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান এই জনপ্রিয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব।