দেশে ইজিবাইক, বৈদ্যুতিক যান ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে লিথিয়াম ব্যাটারির বাজার। তবে এই সম্ভাবনাময় খাতটি ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারের স্ক্র্যাপ, পুরোনো ও লাইফসাইকেল শেষ হওয়া বাতিল ব্যাটারি দেদারসে দেশে ঢুকছে, যার সিংহভাগই আসছে চীন থেকে।
যেভাবে চলছে জালিয়াতি:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব স্ক্র্যাপ ব্যাটারির ভালো সেলগুলো আলাদা করে নতুন কেসিং এবং বিএমএস (ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) লাগিয়ে বাজারে একদম নতুন হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর কাপ্তান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে আসল ব্যাটারির চেয়ে অর্ধেক বা তারও কম দামে এগুলো বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা সস্তা পেয়ে এগুলো কিনলেও মাত্র এক-দুই বছরের মধ্যে ব্যাটারিগুলো কার্যক্ষমতা হারিয়ে ভয়ংকর ই-বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে।
আমদানির নেপথ্যে চতুরতা:
ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এইচএস কোড (HS Code) ব্যবহার করে আইনি চোখ ফাঁকি দিচ্ছেন। কখনো ‘স্ক্র্যাপ ব্যাটারি’, কখনো ‘এনার্জি স্টোরেজ মডিউল’, আবার কখনো ‘সোলার স্টোরেজ ইকুইপমেন্ট’ বা ‘ইলেকট্রনিক পার্টস’ নামে এই বিষাক্ত উপাদানগুলো দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের চরম হুমকি:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো মানের লিথিয়াম ব্যাটারি (যেমন: লিথিয়াম টাইটানেট বা এলটিও) ২৫ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত সেবা দিতে পারে। কিন্তু এই নিম্নমানের ও জোড়াতালির ব্যাটারিগুলো অল্প দিনেই নষ্ট হচ্ছে। এগুলো থেকে নির্গত লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ ও বিষাক্ত ইলেকট্রোলাইট মাটি ও পানিতে মিশে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিতভাবে এগুলো ভাঙার কারণে বিষাক্ত গ্যাস ছড়াচ্ছে এবং অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আধুনিক রিসাইকেলের অভাব:
চীনে ব্যাটারি রিসাইকেল প্রক্রিয়া অত্যন্ত আধুনিক ও সরকারিভাবে ট্র্যাক করা হলেও বাংলাদেশে এখনও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রিসাইকেল শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাঙারির দোকানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ পরিবেশে এসব ব্যাটারি ভাঙা হচ্ছে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজা পারভীন বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে এখনই এই স্ক্র্যাপ লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির আড়ালে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হবে।”